আজ ২৪শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ ও ১০ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ এবং ১৮ই জিলহজ, ১৪৪৫ হিজরি

দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, গত এক বছরে সাত হাজার উদ্ধারঃ উদ্ধার অভিযান অব্যাহত

  • In জাতীয়
  • পোস্ট টাইমঃ ১১ জুন ২০২৩ @ ০৩:৩৭ অপরাহ্ণ ও লাস্ট আপডেটঃ ১১ জুন ২০২৩@০৩:৩৭ অপরাহ্ণ
দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, গত এক বছরে সাত হাজার উদ্ধারঃ উদ্ধার অভিযান অব্যাহত

।।বিশেষ প্রতিনিধি।।

সারা দেশে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির অভিযানে গত এক বছরে সাত হাজার ৪১৭টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই আগ্নেয়াস্ত্র। এক পরিসংখ্যানে দুই মাসে প্রতিদিন গড়ে পাঁচজন করে গুলিবিদ্ধ হওয়ার তথ্য মিলছে।

গত এক বছরে অবৈধ অস্ত্র সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য ও পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা যায়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিরোধ, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং অন্যান্য অপরাধমূলক ঘটনায় প্রকাশ্যে ও আড়ালে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিজ্ঞ মহল। এ ব্যাপারে সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলাবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারে সমন্বিত অভিযান চালাতে সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে- কারা আগ্নেয়াস্ত্র অবৈধভাবে দেশে আনছে। কারা কিনছে, কারা ব্যবহার করছে তা সার্বিকভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ২০২২সালের তথ্য অনুযায়ী- গত এক বছরে সারা দেশে অভিযান চালিয়ে এক হাজার ৩৯৪টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে তারা। এ সময় ৬০২জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে দেশি-বিদেশি রিভলভার ৭১টি, ১৯৫টি দেশি-বিদেশি পিস্তল, একটি এসএমজি, দুটি একে-৪৭ রাইফেল, একটি একে-২২ রাইফেল, তিনটি রাইফেল, ৪৪৩টি ওয়ান শ্যুটার গান, ৪১০টি এয়ারগান, ছয়টি শটগান, ৮২টি পয়েন্ট ২২ বোর রাইফেল, ৮৫টি এসবিবিএল, ২৫টি ডিবিবিএল, ৬৪টি এলজি, তিনটি কাটা রাইফেল, দুটি রকেট লঞ্চার শেল এবং একটি রকেট লঞ্চার। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় ৪৫০টি মামলা করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী- ২০২২সালে ডিএমপি ৬৫টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৬২টি গুলি এবং চার হাজার ২৬৮কেজি বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করেছে। এ সময় অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংক্রান্ত মামলায় ৪১০জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে- ২০২২সালে সারা দেশে আগ্নেয়াস্ত্রসহ পাঁচ হাজার ৮৭৯টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়- উদ্ধার করা অস্ত্রের বেশির ভাগ বিদেশি। এসব অস্ত্র যশোরের বেনাপোল, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, সাতক্ষীরার শাঁকারা, মেহেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা, কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়াসহ অন্তত ৩০টি পথে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ঢুকছে। র‌্যাবের তদন্তে উঠে এসেছে, অস্ত্রের বড় চালানগুলো দেশে ঢোকে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত দিয়ে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) গোয়েন্দা তথ্য বলছে- দেশের সীমান্তগুলোর অন্তত ৩২টি স্থান দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, সম্প্রতি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশের একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা। বিশেষ শাখার (এসবি) ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- গত ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দেশে গুলির ঘটনা ১৫০টি ছাড়িয়ে গেছে। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে পাঁচজনেরও বেশি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে গত মে পর্যন্ত ১৬৫টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এর পর থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ২০টি জেলার দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের একটি সভায়। এসব জেলা হচ্ছে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনী, খুলনা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, মাগুরা, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, বরগুনা, কুড়িগ্রাম ও পটুয়াখালী।

গত ১৯ফেব্রুয়ারি এ নিয়ে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইন-শৃঙ্খলাবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির সভা শেষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন- দেশে বর্তমানে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র আসছে। এসব বেআইনি অস্ত্র দেশের জন্য উদ্বেগজনক। এসব অস্ত্র উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছে আইন-শৃঙ্খলাবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়- জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়ানোর আগেই টানা অভিযান চালিয়ে লাগাম টানতে হবে অবৈধ অস্ত্রের। নির্বাচনের আগে সমন্বিত অভিযান চলবে জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী তালিকাভুক্ত ২০টি জেলাসহ সীমান্তবর্তী ৩২জেলায় অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করেই পেশাদার সন্ত্রাসীরা ছোট-বড় আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ ও নাইন এমএম পিস্তল বেশি ঢুকছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে। পয়েন্ট টু-টু বোরের রিভলভার আসছে সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত দিয়ে। কুমিল্লা, যশোরের বেনাপোল ও হিলি সীমান্ত হয়েও এ ধরনের অস্ত্র ঢুকছে দেশে। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ সেন্টারের (বিডিপিসি) এক গবেষণা অনুযায়ী- দেশে অবৈধ অস্ত্র আমদানির শতাধিক সিন্ডিকেট রয়েছে। অবৈধ অস্ত্রের মালিকরা অস্ত্র ভাড়া দিচ্ছেন একশ্রেণির সন্ত্রাসীর কাছে।

নরসিংদী শহরতলিতে জেলা বিএনপির কার্যালয়ের কাছে সাদেকুর রহমান ও আশরাফুল ইসলাম নামের দুজনকে অবৈধ অস্ত্র দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় চারজন আহত হয়। এ ব্যাপারে নরসিংদী সদর মডেল থানার ওসি আবুল কাসেম ভূইয়া বলেন, তাদের অবৈধ অস্ত্র দিয়ে গুলি করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। গত বৃহস্পতিবার সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে স্থানীয় এক কাউন্সিলর প্রার্থীর বাসার সামনে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই অস্ত্র মহড়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। অতিসম্প্রতি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় কিছু লোকজনকে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ভীতি ছড়াতে দেখা গেছে। গত কয়েক মাসে রাজধানীর পাশাপাশি বরিশাল, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, পাবনা ও যশোর এলাকায় সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ পেয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।

আশার কথা, গত ২০মে নরসিংদীর রায়পুরায় বিদেশি অস্ত্র, গুলিসহ রুবেল ও ইমরান নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, নরসিংদীতে সন্ত্রাসীদের কাছে অর্ধশতাধিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। গত ৭মে রাজবাড়ীর পাংশা থেকে দুটি পিস্তল, রিভলভার, দুটি বোমাসহ রমজান শেখ, সজীব শিকদার ও রাসেল মণ্ডল নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁরা অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্রের সদস্য বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়।

এ বিষয়ে রাজবাড়ীর সহকারী পুলিশ সুপার (পাংশা সার্কেল) সুমন কুমার সাহা জানান- এমন আরো অনেক অবৈধ অস্ত্রধারী আছে এলাকায়। তারা বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলায় তারা অস্ত্র কেনাবেচাও করে। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি, অপারেশনস) মোঃ হায়দার আলী খান বলেন- অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এটা পুলিশের রুটিন কাজ। নিরাপত্তা বিশ্লেষক নূর খান লিটন জানান, নির্বাচন সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্রে দেশে খুনোখুনি বাড়ছে। তবে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীসহ যারা এদের মদদ দেয়, তাদেরও গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

নিউজ শেয়ারঃ

আরও সংবাদ

জনপ্রিয় সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

আলোচিত সংবাদ

নিউজ শেয়ারঃ
শিরোনামঃ
Verified by MonsterInsights