আজ ১৮ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ ও ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ এবং ১২ই জিলহজ, ১৪৪৫ হিজরি

যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চীনের গোয়েন্দা বেলুন?

  • In আন্তর্জাতিক
  • পোস্ট টাইমঃ ১৪ মে ২০২৩ @ ০১:১১ অপরাহ্ণ ও লাস্ট আপডেটঃ ১৪ মে ২০২৩@০১:১১ অপরাহ্ণ
যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চীনের গোয়েন্দা বেলুন?

যুক্তরাষ্ট্রে আকাশে চীনের বেলুন নিয়ে চলছে উত্তেজনা; দেখা দিয়েছে কূটনৈতিক টানাপড়েন, উঠেছে নানা প্রশ্ন।

আলোচনার তুঙ্গে এখন গোয়েন্দা বেলুন, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর সম্প্রতি তাদের আকাশে চীনের একটি বেলুন চিহ্নিত করার পর থেকে শুরু হয়েছে এ আলোচনা।

চীনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মনটানার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বেলুনটি নিছক একটি‘ বেসামরিক আকাশযান’, যা তারা ব্যবহার করছিল মূলত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জন্য। আর সেটা নির্ধারিত পথ থেকে সরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে ঢুকে পড়ে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই বেলুন আসলে অনেক উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া নজরদারির যন্ত্র।

সেই বেলুন যাই করুক না কেন, বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেনের বেইজিং সফর বাতিল করেছে ওয়াশিংটন। দুদিনের সফরে রোববারই তার চীন যাওয়ার কথা ছিল।

এই উত্তেজনার মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, স্যাটেলাইট যুগে এসেও নজরদারির জন্য কেন সনাতনী যন্ত্র বেলুন ব্যবহার করছে বেইজিং?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হল বিবিসি ও সিএনএনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে-

এই বেলুনের পেছনে কী?

বিশ্বে নজরদারি প্রযুক্তির সরঞ্জাম হিসেবে বেলুনের ব্যবহার অনেক পুরনো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে

আগ্নেয় বোমা ফেলতে এর ব্যবহার করেছিল জাপান। এছাড়া স্নায়ুযুদ্ধের সময়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত

ইউনিয়ন বেলুনের ব্যাপক ব্যবহার করেছিল।

খুব সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে অনেক উপড়ে উড়ে বেড়ানো বেলুনটি ধরা পড়ে পেন্টাগনের নজরদারি

নেটওয়ার্কে। পেন্টাগন কর্মকর্তারা বলছেন, চীনা বেলুনটি উড়ছিল আকাশে উড়োজাহাজ চলাচল সীমার অনেক

উপর দিয়ে।

আধুনিক বেলুন সাধারণত পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ২৪ কিলোমিটার থেকে ৩৭ কিলোমিটার উপরে উঠতে পারে।

স্বাধীন আকাশ প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হি ইউয়ান মিং বিবিসিকে বলেন, বেইজিং সম্ভবত ওয়াশিংটনকে সংকেত

দেওয়ার চেষ্টা করছে।

“আমরা যেমন সম্পর্ক উন্নত করতে চাই, তেমনি প্রয়োজনীয় যে কোনো উপায়ে টেকসই প্রতিযোগিতার জন্যও

প্রস্তুত, তবে তা তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি না করে। আর এর জন্য আপাতদৃষ্টিতে ‘নিরীহ’ বেলুনের চেয়ে ভালো হাতিয়ার

আর কী হতে পারে?”

ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির কাছাকাছি বেলুনের অবস্থানের মানে দাঁড়ায় সেটি অপ্রত্যাশিতভাবে চলে গেছে, বলেন তিনি।

সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চীনা প্রোগ্রামের কো-অর্ডিনেটর ড. হো বলেন,

“আমেরিকান অবকাঠামোতে গোয়েন্দা নজরদারি কিংবা যে তথ্য পেতে চাইছে, সেটির অন্য উপায় রয়েছে

তাদের। বেলুনটি পাঠানোর উদ্দেশ্য আমেরিকানদের কাছে একটি সংকেত পাঠানো এবং তারা কেমন প্রতিক্রিয়া

দেখায় সেটি পরখ করা।”

চীন চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র বেলুনটি শনাক্ত করুক, এমনও মনে করেন তিনি।

কার্নেগি কাউন্সিল ফর এথিক্স ইন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের আর্থার হল্যান্ড মিশেল বলেন, চীন হয়ত বেলুনটি

ব্যবহার করে দেখাতে পারে যে, তাদের একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সক্ষমতা রয়েছে; যা উভয়ের মধ্যে গুরুতর

উত্তেজনার ঝুঁকি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে প্রবেশ করতে পারে। আর সেটি দেখানোর জন্য বেলুন একটি সেরা

পছন্দ হতে পারে।

তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেলুনকে স্পাই ক্যামেরা ও রাডার সেন্সরের মতো আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে কাজে

লাগানো যেতে পারে এবং নজরদারির জন্য বেলুন ব্যবহারের কিছু সুবিধা রয়েছে; যার একটি হলো- এটি ড্রোন বা

স্যাটেলাইটের তুলনায় কম ব্যয়বহুল আর কাজে লাগানোও সহজ।

আকাশে বেলুনের ধীর গতিতে উড়ে চলার ফলে দীর্ঘ সময়ের জন্য লক্ষ্যবস্তুতে নজরদারির সুযোগ তৈরি করে

দেয়। বিপরীতে স্যাটেলাইটের গতিবিধি তার কক্ষপথেই সীমাবদ্ধ।

গুপ্তচরবৃত্তিতে কি এখন স্যাটেলাইট ব্যবহার হয় না?

অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের ফেলো এবং রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা

পিটার লেটন জানান, স্নায়ু যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র নজরদারি অস্ত্র হিসেবে শত শত বেলুন ব্যবহার করেছিল।

কিন্তু আধুনিক যুগে গোয়েন্দা তথ্যের জন্য স্যাটেলাইট প্রযুক্তির আবির্ভাবে নজরদারি বেলুনের ব্যবহার হালের

পুরনো ফ্যাশন বলে মনে করেন তিনি।

ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো অনেক ছোট করে ফেলার সাম্প্রতিক অগ্রগতির মানে হলো, ভাসমান নজরদারি

প্ল্যাটফর্মগুলো আধুনিক গুপ্তচরবৃত্তির টুলকিটে ফিরতে পারে।

লেটন জানান, বেলুনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া সরঞ্জামগুলোর ওজন এখন হালকা করা যায়। ফলে বেলুনগুলোও

এখন স্যাটেলাইটের তুলনায় ছোট, সস্তা আর সহজে উৎক্ষেপণ করা যায়।

আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিরক্ষা নীতির বিশেষজ্ঞ ব্লেক হার্জিংগার জানান,

বেলুনের ধীর গতি সত্ত্বেও সেগুলো সবসময় সহজে ধরা পড়ে না। সেইসঙ্গে বেলুন এমন কিছু জিনিস করতে পারে,

যা স্যাটেলাইট পারে না।

তিনি বলেন, মহাকাশভিত্তিক সিস্টেমগুলো ভালো, তবে কক্ষপথে সেগুলো আরও বেশি অনুমাননির্ভর। বেলুনের

একটি সুবিধা হলো বাতাসের সুবিধা নিয়ে সেগুলো অনবোর্ড কম্পিউটার ব্যবহার করে পরিচালনা করা যায়। ঘুরে

বেড়াতে পারে সীমিত পরিসরে। কিন্তু একটি স্যাটেলাইট যেখানে সেখানে ঘুরতে পারে না এবং নজরদারির জন্য

নির্দিষ্ট এলাকা প্রদক্ষিণ করাতে অনেকের প্রয়োজন হয়।

এটা গুপ্তচরবৃত্তি হতে পারে?

লেটনের মতে, সন্দেহজনক চীনা বেলুন সম্ভবত মার্কিন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং রাডারের তথ্য সংগ্রহ করছে। এই

সিস্টেমগুলোর মধ্যে কিছু সরঞ্জাম স্বল্প দূরত্বের অত্যন্ত উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে এবং নজরদারির

লক্ষ্যবস্তুতে অনেক বেশি দিক-নির্দেশনামূলক হতে পারে। এ জাতীয় নির্দিষ্ট প্রযুক্তি সরঞ্জামের ক্ষেত্রে

স্যাটেলাইটের চেয়ে একটি বেলুন ভালো প্লাটফর্ম হতে পারে।

লেটনের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন মার্কিন বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সিএনএনের সামরিক

বিশ্লেষক কর্নেল সেড্রিক লেইটন। চীন এর মাধ্যমে মোবাইল ফোন ও রেডিও ট্রাফিকেও নজরদারি চালাতে পারে

বলে সিএনএনকে জানান তিনি।

বিশ্লেষকদের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, চীনা বেলুন সর্বশেষ যে অবস্থানে ছিল সেই মনটানা এবং আশপাশের

রাজ্যগুলোতে মার্কিন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো এবং কৌশলগত বোমারু ঘাঁটিগুলো

রয়েছে।

বেলুনটি নামানো হচ্ছে না কেন?

বেলুনটি যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে না পারে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে

পেন্টাগন।

তবে বেলুনটি উড়তে দেখার পরও যুক্তরাষ্ট্র সেটি গুলি করে ভূপাতিত করার সিদ্ধান্ত নেয়নি; কারণ ওই বেলুনের

অবশেষ নেমে এলে তা নিচের জনবসতিতে ক্ষতির কারণ হতে পারে। যদিও সেটিকে যদি ভূপাতিত করতেই হয়

সেজন্য মার্কিন সরকার জঙ্গি বিমান প্রস্তুত রেখেছে।

অস্ট্রেলিয়ার বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা পিটার লেটন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সীমার মধ্যে ওই বেলুনকে অক্ষত

নামিয়ে আনা গেলে বেলুনের রহস্য বা গোপন বিষয়গুলো জানা যেতে পারে।

বেলুনটি গুলি করে ভূপাতিত করার কথাটি শুনতে সহজ হলেও বিষয়টি অতটা সহজ নয় বলে মন্তব্য করে এই

বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ম্যারাথন ইনিশিয়েটিভের উইলিয়াম কম।

তিনি বলেন, “বললেই তো হল না। এতে যদি গুলি করে ফুটোও করা হয়, তাতেও এটি চুপসাবে ধীরে ধীরে।”

১৯৯৮ সালে একটি আবহাওয়া বেলুন ফুটো করতে জঙ্গি বিমান পাঠানোর ঘটনাটি তুলে ধরে তিনি বলেন, “তারা

বেলুনটিতে হাজার খানেক গুলি ছুড়েছিল, তারপরও সেটা নামতে ছয় দিন লেগেছিল।”

সিএনএন জানিয়েছে, চীনের বেলুনটিতে গোপন কিছু বা নজরদারির কোনো কিছু নাও থাকতে পারে। এটা হতে

পারে কেবলই একটা দুর্ঘটনা। বেলুনটি বাতাসে ভেসে আসতে পারে অথবা চীনা অপারেটরা কোনোভাবে সেটির

নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে।

এ ব্যাপারে প্রতিরক্ষা নীতি বিশেষজ্ঞ হার্জিংগার বলেন, “অন্তত কিছু সম্ভাবনা আছে যে, এটা হতে পারে একটি

ভুল ছিল এবং বেলুনটি এমন কোথাও গিয়ে ঠেকেছে, যা বেইজিং আশাই করেনি।”

নিউজ শেয়ারঃ

আরও সংবাদ

জনপ্রিয় সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

আলোচিত সংবাদ

নিউজ শেয়ারঃ
শিরোনামঃ
Verified by MonsterInsights