আজ ১১ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ও ২৭শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ এবং ২৬শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

মিথ্যা অপবাদে ছেলেকে হারিয়ে মায়ের আহাজারি

মিথ্যা অপবাদে ছেলেকে হারিয়ে মায়ের আহাজারি
ছবি- বিডিহেডলাইন্স

হারুন-অর-রশীদ
ফরিদপুর প্রতিনিধি।।

ফরিদপুরে গাছ থেকে সুপারি চুরির অপবাদ দিয়ে রাজেন বেপারী (১৮) নামের এক যুবককে মারপিট করে স্থানীয় এক ব্যক্তি। অপবাদ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ওই যুবক। এদিকে একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা-বাবা। তাদের আহাজারিতে আশ পাশের পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে।

একমাত্র পুত্র রাজেনকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা সুফিয়া ও বাবা মান্নান মিয়া। তাদের আহাজারি থামছেই না। কান্না করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন সুফিয়া বেগম। তাদের দু’জনের আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। পাশে থাকা সকলের চোখেই জল। কেউই একমাত্র ছেলের এধরনের মৃত্যু সইতে পারছেনা।

জানা যায়, ফরিদপুর সদর উপজেলার গেরদা ইউনিয়নের জুয়াইর গ্রামের বাসিন্দা মান্নান বেপারি। তিনি ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। একমাত্র ছেলে রাজেন ও স্ত্রী সুফিয়া আক্তারকে নিয়ে তার সংসার। খুব কষ্টের মধ্যে দিয়ে ছেলেকে এইচএসসি পাস করিয়েছেন। গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজন পাশ্ববর্তী বাখুন্ডা গ্রামের দিদার মিয়ার সুপারি গাছ থেকে এক থোকা সুপারি পাড়েন। ওই সময় যাচ্ছিলেন ওই এলাকার সরোয়ার মিয়া। সরোয়ার মিয়া সুপারি চুরির অপবাদ দিয়ে রাজনকে মারপিট করে।

রাজেন বাড়িতে এসে কাউকে কিছুই বলেনা। কারো সাথে কোনো কথাও বলেনা। ঘর থেকে বের হতো না কয়েকদিন। এরপর শনিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকালে মায়ের সাথে একসাথে ভাত খায় রাজেন। চুরির অপবাদ সহ্য করতে না পেরে সন্ধ্যার দিকে নিজ ঘরের আড়ার সাথে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। রাজেন গত বছর আলহ্বাজ আব্দুল খালেক ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে মৌসুমী ব্যবসা করতো সে।

রাতে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছে।

রাজেনের মা সুফিয়া আক্তারের কান্না থামছেই না। কান্না করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। তিনি শুধু বলছেন, আমি কি নিয়ে বাঁচবো। আমার একমাত্র ছেলেকে ছাড়া আমি বাঁচতে চাইনা। ও কেমনে এমন করলো। আমার মনি আমারে বলল, ”মা আমাকে খেতে দাও। খাওয়ার সময় বলল, আরো ভাত দেও। খাওয়ার পর আর মনির সাথে আমার কথা হয় নাই। আমার মনিরে আনে দেও। আমার মনি কত ভালো ছিল, তারে সুপারি চোর বানায়ে মারলো ওরা, এটা সহ্য করতে পারেনি আমার মনি, তাই চলে গেলো”।

রাজেনের বাবা মান্নান বেপারি বলেন, আমার পোলাডারে মিথ্যা চুরির অপবাদ দিয়ে মারপিট করেছে সরোয়ার। আমার মনি এই অপবাদ সহ্য করতে না পেরে অনেক দূরে চলে গেলো। অনেক মারছে আমার মনিরে। ভয়ে আমাদের কারো কাছেই একথা বলে নাই। নিজে নিজেই বুকের মধ্যে কষ্ট চেপে রেখে চলে গেলো। আমরা কাকে নিয়ে বাঁচবো।

রাজেনের চাচী সাবিনা বেগম বলেন, আমার মনিরে যখন সরোয়ার মারতেছে, এমন খবর পেয়ে আমি দ্রুত ওই খানে যাই। কিন্তু ওই খানে গিয়ে মনিরে আর পাই নাই। পরে বাড়ি চলে আসি। রাতে ওর কাছে শুনি কি হইছে, কিছু বলেনা। পরদিন সকালে আমারে বলে চাচী আমারে খুব মারছে সরোয়ার ভাই। আমার কানে মারছে আমি কানে কিছু শুনতে পাচ্ছি না। শরীরেও অনেক ব্যাথা। আমার মনি এই চুরির অপবাদ দিয়ে মারপিট সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। সরোয়ারের জন্য আমার মনি আত্মহত্যা করেছে। সরোয়ারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানাই।

এদিকে রোববার বিকাল (সাড়ে ৫টা পর্যন্ত) রাজেনের মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। ময়না তদন্ত সম্পন্ন হলে মরদেহের দাফন সম্পন্ন করা হবে বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে।

ফরিদপুর কোতয়ালী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল খায়ের শেখ জানান, রাজেনের মরদেহের সুরতহাল শেষে ময়না তদন্তের জন্য ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো অভিযোগ পাইনি, অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

এদিকে ফরিদপুর সদর উপজেলার বাখুন্ডা গ্রামের বাসিন্দা সরোয়ার মিয়াকে এলাকায় গিয়ে পাওয়া যায়নি। এবিষয়ে তার বক্তব্য জানতে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

আরও সংবাদ

জনপ্রিয় সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

আলোচিত সংবাদ

শিরোনামঃ