রফিক প্লাবন
দিনাজপুর প্রতিনিধি।।
শতবর্ষী সৃজনশীল সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান দিনাজপুর নাট্য সমিতি’র মঞ্চে প্রদর্শিত হলো মোহিত চট্টোপাধ্যায় রচিত দর্শক নন্দিত নাটক “ক্যাপ্টেন হুররা”। ৪৬ বছর পর তরুণ নাট্য নির্দেশক নয়ন বার্টেলের হাত ধরে নাটকটি নতুন রূপে-নতুন সাজে আবারো মঞ্চস্থ হলো প্রাচীন এই মঞ্চে। নাট্যামোদি দর্শকের উপচেপড়া ভির দেখেই মনে হয়েছে “ক্যাপ্টেন হুররা”র আবেদন দর্শকদের কাছে এতটুকুও কমেনি।
গত শুক্রবার (১ সেপ্টেম্বর ২০২৩) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় শুরু হয় নাটকটি। প্রচন্ড গরমের মধ্যেও নাটকটি হাউজফুল শো-তে পরিণত হয়। এক পর্যায় স্ট্যান্ডিং টিকিট দিতে বাদ্য হয় কর্তৃপক্ষ। একক নাটকে দিনাজপুর নাট্য সমিতির ইতিহাসের সর্বোচ্চ টিকিট সেল হয়েছে বলেও জানায় কর্তৃপক্ষ।
যে “ক্যাপ্টেন হুররা”কে দিনাজপুরের নবরূপী তথা উত্তরবঙ্গের প্রথিতযশা নাট্যকার, নাট্য নির্দেশক শাহজাহান শাহ আপন মহিমায় সাজিয়েছিলেন একভাবে। যে “ক্যাপ্টেন হুররা”কে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির “শিল্পকলা পদক” প্রাপ্ত নাট্য ব্যক্তিত্ব সর্বজন শ্রদ্ধেয় দিনাজপুর নাট্য সমিতির নাট্যাধ্যক্ষ জীবন্ত কিংবদন্তী কাজী বোরহান উদ্দিন রূপায়িত করেছিলেন তাঁর শিল্প সৌরভ দিয়ে। যার কারণে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত “জাতীয় নাট্যোৎসবে” দিনাজপুর নাট্য সমিতি “এ” গ্রেডের নাট্যদল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। সেই “ক্যাপ্টেন হুররা” দীর্ঘ বিরতির পর নতুন শৈষ্ঠবে আবার মঞ্চে আসছে এ যুগের নব নাট্যচিন্তক, উদীয়মান নাট্য প্রতিভা, দিনাজপুর নাট্য সমিতির অন্যতম নাট্য নির্দেশক নয়ন বার্টেল এর নির্দেশনায়।

“ক্যাপ্টেন হুররা” নাটকের পূর্বসুরি নির্দেশক শ্রদ্ধেয় প্রয়াত শাহজাহান শাহ ও নাট্য সমিতির নাট্যাধ্যক্ষ কাজী বোরহান উদ্দিনের নাট্যশিষ্য ও উত্তরসুরিই হচ্ছেন এই নয়ন বার্টেল ।
নির্দেশক নয়ন বার্টেল বলেন, বর্তমান সময়েও “ক্যাপ্টেন হুররা” নাটকটি বড়ই প্রাসঙ্গিক। তাই আমার গুরুদের উৎসর্গ করে নব নাট্যায়নে সময় উপযোগী করে মঞ্চে আনা হচ্ছে। আমাদের সমাজে নানান রূপের নানান অঙ্গের মানুষ বিদ্যমান। এঁদের মধ্যে অধিকাংশই নিজ নিজ জীবন প্রবাহ নিয়ে ব্যস্ত। সবাই নিজের সুখ, বৈভব, ছোট্ট সংসার, অহেতুক হতাশা, ঠিক-বেঠিক না ভেবেই জীবিকার্জনে নিয়োজিত। আবার এক ধরনের মানুষ আছে যারা নানান কৌশলে আম-জনতার মাথার উপর তাদের শাসন দণ্ড ঘুরিয়ে শোষণ-তোষণের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। এরা সংখ্যায় নগন্য হলেও অত্যন্ত ভয়ংকর। মোহিত চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের অনবদ্য সৃষ্টি “ক্যাপ্টেন হুররা”র ক্যাপ্টেন এই নিপীড়কদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে নিপীড়নের শিকার ওইসব উদাস মানুষদের সংঘবদ্ধ করার জন্য বিরামহীন কাজ করে যাচ্ছেন।
ওইসব মানুষ যাঁরা নিজেদের ছোট্ট গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চায় না, সমাজ সংস্কারের দায়িত্ব নিতে চায় না, জীবন-মৃত্যুর নিয়ম রক্ষা করতে যারা অসচেতন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক জায়গায় ঘুরতেই সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এরা মূলত: নিজেদের তথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বড়ই উদাসীন। অন্তিমে ক্যাপ্টেন তাঁর ভাইসসহ সবাইকে নিয়ে পৌঁছে যান তাঁদের স্বপ্নের সেই মানচিত্রের দেশে। আর এভাবেই আমরা আমাদের সোনার দেশে পৌঁছেই যাবো একদিন। কিন্তু চক্রান্তকারীরা হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারা এখনো তৎপর আমাদের সুখ কেড়ে নিয়ে আমাদের মা’কে কাঁদাতে। তাই ঐক্য, সংঘবদ্ধতার কোন বিকল্প নেই। তিনি বলেন, আমি দিনাজপুর নাট্য সমিতির সভাপতি চিত্ত ঘোষ, সাধারণ সম্পাদক রেজাউর রহমান রেজু, সহনাট্যাধ্যক্ষ তরিকুল আলমসহ পরিচালনা পরিষদের সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। সর্বোপরি কৃতজ্ঞতা জানাই দিনাজপুরে আমার সুপ্রিয় নাট্যামোদি দর্শকদের প্রতি।
এ নাটকে অভিনয় করছেন- হারুন-উর রশীদ (ক্যাপ্টেন হুররা), শশাংক সাহা বাবুন (ভাইস ক্যাপ্টেন গুগলু), সেখ ছগীর আহাম্মদ কমল (সুনীল), মসলেহা মলি (ইরা), তরিকুল আলম (লিডার), তারিকুজ্জামান তারেক (মেজর), দেবেশ্বর সিং (ফান্টুস), অমিত দাস (যুবক)।
উল্লেখ্য, ৪৬ বছর আগে “ক্যাপ্টেন হুররা” নাটকের নির্দেশক ক্যাপ্টেন চরিত্রে অভিনয় করা কিংবদন্তি কাজী বোরহান, যুবক চরিত্রে অভিনয় করা সামসুল আলম দর্শকসারিতে বসে নাটকটি উপভোগ করেন এবং সেই সময়ে ফান্টুস চরিত্রে অভিনয় করা তরিকুল আলম ৪৬ বছর পর এবার লিডার চরিত্রে অভিনয় করেন। নাটক শেষে দিনাজপুর নাট্য সমিতির সভাপতি চিত্ত ঘোষ উপস্থিত সকল দর্শক এবং নাটকের কলা কুশলীদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
এছাড়া অন্যান্য কলাকুশলীদের মধ্যে- মঞ্চ নির্মাণ: শশাঙ্ক সাহা বাবুন, আলো, মঞ্চ, আবহ পরিকল্পনা ও নির্দেশনা: নয়ন বার্টেল, রূপসজ্জা: হারুন-উর-রশীদ, মঞ্চ ব্যবস্থাপক: সাইফুল ইসলাম, আবহ প্রক্ষেপক: অমিত দাস, দ্রব্য সামগ্রী: আসাদুজ্জামান বাবু, পোশাক: দলগত উদ্ভাবন, প্রচার: নুরুল মতিন সৈকত, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, প্রেক্ষাগৃহ নিয়ন্ত্রক: শহীদুল ইসলাম শহীদুল্লাহ, টিকিট বিপণন: আব্দুল হান্নান, শিখা রায়, ক্বোরাইশা আক্তার স্মৃতি।
এর আগে গত ৮ জুলাই শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় নাট্য সমিতি মিলনায়তনে নাটকটির শুভ মহরত অনুষ্ঠিত হয়।





















