।।বিশেষ প্রতিবেদক।।
দীর্ঘ ১৬ মাস পর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৪–দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন বুধবার সন্ধ্য ৭টায়। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, জোটভূক্ত দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের ‘একলা চলো’ নীতি নিয়ে ক্ষোভ ও বেদনা রয়েছে। শেখ হাসিনা সেই মানঅভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করবেন। একইসঙ্গে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আগামী নির্বাচনের করণীয় নিয়েও আলোচনা হবে।
জোটের শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনা শরিকদের নিয়ে সর্বশেষ বৈঠক করেছিলেন গত বছরের ১৫ মার্চ। সেই বৈঠকও হয়েছিল ২০১৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার প্রায় তিন বছর পর। এখন শেখ হাসিনা জোটের শরিকদের নিয়ে এমন এক সময় বৈঠক করতে যাচ্ছেন, যখন নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিরোধ থেকে বিএনপির নেতৃত্বে বিভিন্ন দল ও জোট সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে গেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকেও সরকারের ওপর একধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।
শেখ হাসিনা গত বছরের ১৫ মার্চে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে বসছিলেন জোট নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সূত্র বলছে, সেই বৈঠকে ১৪ দলীয় জোটের নেতারা পাওয়া না পাওয়ার বেদনার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। তিনি জোট নেতাদের বেদনার কথা মন দিয়ে শোনেন। একই সঙ্গে তাদের আগামী নির্বাচনী দল বিবেচনা করে প্রত্যেককে ন্যূনতম একটি আসন দেওয়ার আশ্বাস দেন। শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ১৪ দলীয় জোট আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে জোটের আরেকটি শরিক দলের একজন নেতা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা গত বছরের মার্চে জোটের শরিকদের নিয়ে সর্বশেষ যে বৈঠক করেছিলেন, সেই বৈঠকে আগের তিনটি নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় আগামী জাতীয় নির্বাচনও জোটগতভাবে করার কথা বলা হয়েছিল। তবে অবহেলা, অবমূল্যায়নসহ নানা অভিযোগে জোটের শরিকদের মধ্যে মান–অভিমান ও ক্ষোভ রয়েছে অনেক দিন ধরে। বিভিন্ন সময় শরিক দলগুলোর কোনো কোনো নেতা তা নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্যও দিয়েছেন।
নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকদের তৎপরতা এখন চোখে পড়ার মতো। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া ঢাকা সফর করে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করেছেন। এর আগে গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসা নীতি দিয়েছে। নির্বাচনী পর্যবেক্ষক পাঠানো হবে কি না, সে ব্যাপারে পরিস্থিতি যাচাইয়ের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধিদল ১৬ দিনের সফরে এখন ঢাকায় রয়েছে। এমন এক পটভূমিতে ক্ষমতাসীন ১৪–দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক ডাকা হয়েছে। এই জোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, জোটের শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁদের বৈঠকে আগামী নির্বাচন, বিরোধী দলের আন্দোলনসহ সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে।
শরিক দলের এক নেতা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এখন বুধবারের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে জোটের শরিকদের ক্ষোভ ও মান–অভিমানের বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। বুধবার আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে ওই বৈঠকে জোটের প্রতিটি শরিক দলের দুজন করে শীর্ষ নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। দলগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়কেরা বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
২০০৯ সাল এবং ২০১৪ সালে সরকার গঠনের পর জোট শরীরকদের মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হলেও ২০১৯ সালে টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের সরকারের অংশিদারত্ব দেয়নি। অর্থ্যাৎ শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় শরীক দল থেকে কাউকেই রাখা হয়নি। ২০১৯ সালে সরকার গঠনের পর ১৪ দলীয় জোট মূলত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। জোটের নিয়মিত সভাও হয়নি। অবশ্য এর আগের দিনগুলোতে রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে ১৪ দলীয় জোট রাজপথে সবর ভূমিকায় ছিল। কিন্তু গত পাঁচ বছর ১৪ দলীয় জোট শরীকরা জোটগতভাবে রাজপথে তেমন কোনো ভূমিকায় ছিল না। এসব নিয়ে অবশ্য বিভিন্ন সময় শরীকদের মধ্যে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে। ১৪ দলীয় জোট শরীকদের অনেকে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সরকারের অংশিদারত্ব না রাখা এবং জোটকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখাসহ নানা কারণে জোটের নেতৃত্বে থাকা আওয়ামী লীগের ওপর ক্ষোভ ও অভিমান ছিল শরীক দলগুলো। আজ বুধবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন গণভবনে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট শরীকদের সঙ্গে বসছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও দলটির সিনিয়র নেতারা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বুধবারের সেই বৈঠককে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, সভায় শরীকদের কথা শুনবেন আওয়ামী লীগ এবং কোনো মান-অভিমান থাকলে তিনি তা ভাঙবেন। এবং আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে করণীয় ঠিক করবেন। এছাড়াও আজকের ১৪ দলীয় জোটের সভায় চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে এবং শরীকদের পরামর্শের আলোকে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ১৪ দলীয় জোট মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি জোট। তবে জোট নিয়ে এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ কী কৌশল নিয়েছে, সেটি পরিষ্কার নয়। আমাদের দলের বিভিন্ন কর্মসূচি থাকলেও ১৪ দলের দুই একটি ভার্চ্যুয়ালি বৈঠক ছাড়া ঐক্যবদ্ধ কোনো কর্মসূচি নেই। তবে আজকের সভায় দেশের চলমান পরিস্থিতি ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হবে। এ থেকে হয়তো আশার আলো দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, বুধবার জোট নেত্রী মূলত নির্বাচনকে সামনে রেখে সভা ডেকেছেন। এই নির্বাচন কিভাবে হবে, শরীক দলগুলোর ভূমিকা কি হবে সেসব বিষয় নিয়ে কথা হবে। তিনি চান, আগামী নির্বাচনে তার দলের নেতারা যেন ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।






















