আজ ১৩ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ ও ৩০শে চৈত্র, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ এবং ৪ঠা শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি

ফেনী নদীর পানি উত্তোলনের পদ্ধতি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত মতবিরোধ

ফেনী নদীর পানি উত্তোলনের পদ্ধতি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত মতবিরোধ
।।বিশেষ প্রতিবেদক।।
বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহারের পদ্ধতি নিয়ে ভারতের দেয়া প্রস্তাবের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
ভারত চাইছে তারা নদীর মাঝখানে গভীরে কূপ খনন করে পাইপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করবে। কিন্তু বাংলাদেশ এ প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। ঢাকা তাদের প্রস্তাবে নদীর পাড়ে কূপ খনন করে পানি প্রত্যাহার করতে  বলেছে।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুম অঞ্চলে খাবার পানির সংকট দূর করতে ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি উত্তোলনের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে ২০১৯ সালের ৫ই অক্টোবর সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। সমঝোতা বাস্তবায়নে গত ১২ই জুন দুই দেশের টেকনিক্যাল কমিটি কূপ খননের স্থান নির্ধারণ ও পানি উত্তোলনের পদ্ধতি চূড়ান্ত করতে নদীর সম্ভাব্য কিছু স্পটে যৌথ পরিদর্শন করেন। কিন্তু পানি উত্তোলনের পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধের কারণে কোন সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারেননি কর্মকর্তারা।
সে সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়, ফেনী নদীর মৈত্রী সেতু থেকে কয়েক মিটার দূরে ভারতীয় অংশে নদীর পাড়ে এই কূপ খনন করতে এবং সেখান থেকে নালার মাধ্যমে পাম্পের সাহায্যে পানি উত্তোলন করা হবে। কিন্তু ভারত তাদের প্রস্তাবে নদীর মাঝখানে কূপ খননের কথা বলে আসছে। ভারতের দাবি, খাল কেটে পাম্প দিয়ে পানি প্রত্যাহার করলে বার বার পলি জমে যাবে। কিন্তু নদী থেকে সরাসরি পানি তুললে সেই আশঙ্কা নেই। আবার খাল খনন করা বা রক্ষণাবেক্ষণের ঝক্কিও থাকবে না।বিপরীতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি দেয়া হয়, এ ধরণের পলি প্রতিরোধে আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে।
ভারতের এই প্রস্তাবনার প্রকৌশলগত যথার্থতা খতিয়ে দেখতে গত ১২ই জুন দুই দেশের যৌথ কারিগরি কমিটি মূলত নদীর বর্তমান পানি প্রবাহ এবং কূপ খননের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করতে সেখানে যান। পরিদর্শন শেষে বৈঠকে ‘নদীতে কূপ খনন’ এবং ‘নদীর পাড়ে কূপ খনন’ এ নিয়ে দেই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। দুই পক্ষ কেবল যার যার প্রস্তাব শুনেছেন। এর আগে গতবছরও যৌথ কমিটি ঐ এলাকা পরিদর্শন করে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। এ নিয়ে দুই দেশের প্রকৌশলীরা তাদের প্রস্তাবনা লিখিতভাবে প্রথমে যৌথ নদী কমিশনে এবং সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা জানিয়েছে।
এ বিষয়ে ভারতের প্রতিনিধি দলের প্রধান ত্রিপুরার পিডব্লিওডি চিফ ইঞ্জিনিয়ার শ্যাম লাল ভৌমিক সাংবাদিকদের জানান, “বাংলাদেশ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল নদীর পাড়ে কূপ খননের জন্য। আমরা কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের বুঝিয়েছি, নদীর পাড়ে কূপ খনন করলে কী ধরণের সমস্যা হতে পারে।” তিনি বলেন, “আমরা চাইছি যে নদীর মাঝখানে কূপ খনন হোক। বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা বলেছেন তারা এ বিষয়ে তাদের মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলে আমাদের জানাবেন। আমরা আমাদের প্রস্তাবনা পাঠাবো। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পেলেই কাজ শুরু হয়ে যাবে।”
যৌথ নদী কমিশনের সদস্য আবুল হোসেন বলেন, “গত বছর দুই দেশ সম্মত হয়েছিল যে, ভারত তাদের অংশে নদীর পাড় থেকে ৫০ মিটার ইনটেক চ্যানেল বা খাল কাটবে। সেখানে পাম্প বসিয়ে তারা পানি উত্তোলন করবে। এ নিয়ে তারা আগে সম্মত হলেও এখন তারা বলছেন খাল কাটলে সেখানে পলি জমে যাবে। আমাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কংক্রিটের বেষ্টনী দিয়ে পলি আটকে দেয়া যেতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “ভারত চাইছে নদীর মাঝখান থেকে পানি তুলতে। অথচ এ নিয়ে গত বছর কোন আলোচনাই হয়নি। বিষয়টি দুই দেশের প্রকৌশলীরা খতিয়ে দেখছেন। নতুন লোকেশন নিয়েও তারা আলোচনা করেছেন।”
নদীর গভীরে কূপ খননে সমস্যা কী: ভারতের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নদীর মাঝখানে কূপ খনন করা হলে নদী ভাঙনের ঝুঁকি রয়েছে বলে যৌথ নদী কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ আইনূন নিশাত বিবিসি বাংলাকে বলেন, নদীর গতিপথ, বাঁক এবং এর গভীরতা ক্রমশ পরিবর্তনশীল। এজন্য ভারত যে পাড়ে খাল কেটে পানি উত্তোলন করবে ১০ বছর পর তা অগভীর হয়ে যেতে পারে। কিন্তু নদীর গভীরে মাঝখান থেকে পানি তুললে নদীর আচরণে পরিবর্তন হবে। এর প্রভাবে পাড় ভাঙতে শুরু হবে।
এছাড়া নদীর মাঝখান থেকে পানি উত্তোলন করা হলে নদী প্রবাহ ও নদীর নাব্যতায় প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো)’র সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক।
এর কারণ হিসেবে তিনি বলছে ফেনী নদী এমনিতেই সংকীর্ণ। ফলে পানির অভাবে সহজেই শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
অবৈধ পাম্প সরানোর আগে সমঝোতা নিয়ে প্রশ্ন :২০১৯ সালে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সমঝোতা স্মারক হবার পর বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, সম্পূর্ণ মানবিক কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দুদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি ত্রিপুরার সাব্রুম শহরে সরবরাহ করা হবে, যাতে সেখানে পানীয় জলের প্রয়োজন মেটানো যায়। নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি উত্তোলন মানে প্রতি সেকেন্ডে ৫২ লিটার এবং দিনে প্রায় ৪৫ লাখ লিটার পানি প্রত্যাহার করা। তবে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কয়েক দশক আগে থেকেই এই নদীটি থেকে ভারত অবৈধভাবে পানি প্রত্যাহার করে আসছে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ তুলেছেন। এ বিষয়ে সুরাহা না করেই নতুন করে পানি উত্তোলনের সমঝোতা করা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
ইনামুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ভেঙ্গে শূন্য রেখা থেকে দেড়শ গজ ভেতরে ভারতের সাবরুম মহকুমার কয়েকটি পয়েন্টে কমবেশি অন্তত ৫০টি পাম্প বসানো হয়েছে বলে জরিপে দেখা গেছে। বিদ্যুৎচালিত উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্পের মাধ্যমে দেশটি একতরফাভাবে নদীর থেকে পানি তুলে নিচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। তিনি বলেন, এ পাম্পগুলোর প্রতিটির ন্যূনতম ক্ষমতা দুই কিউসেক।
বিবিসির সংবাদদাতা, সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর পর রামগড় এলাকায় গিয়ে নদীর তীরে ভারতীয় অংশে এরকম পানির পাইপ এবং পাম্প মেশিনের অস্তিত্ব দেখেছেন। তখন স্থানীয়রা বলেছিলেন, ২০০২ সাল থেকে এখান থেকে পানি তুলছে ভারত। অবৈধভাবে পানি উত্তোলনের কারণে শুষ্ক মৌসুমে নদীর বিভিন্ন স্থানে বালুচর জেগে ওঠার পাশাপাশি দুই তীরে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ‘মুহুরি প্রজেক্ট’ হুমকির মুখে পড়েছে বলে মত পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো)’র সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হকের।
“সমঝোতায় যে পরিমাণ পানি উত্তোলনের কথা বলা হয়েছে সেটুকু করলে খুব একটা প্রভাব পড়তো না। কিন্তু ভারত অবৈধভাবে আগে থেকেই পানি তোলায় মুহুরি প্রজেক্টে পানি কম আসছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর আরও নেমে যায়। সেচ দেয়ার অবস্থা থাকে না।”
অবৈধ পানি উত্তোলন ঠেকাতে যৌথ নদী কমিশনসহ দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠকে বাংলাদেশ আপত্তি জানালেও ভারত কোন পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দক্ষতা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন। ইনামুল হক মনে করেন, যৌথ নদী কমিশনকেও যথেষ্ট তথ্য সমৃদ্ধ হয়ে বিষয়টি মোকাবিলা করা প্রয়োজন এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করা জরুরি।
এর আগে, দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের বৈঠকে শূণ্য রেখা থেকে পাম্প সরিয়ে নিতে বিএসএফ এর সঙ্গে বৈঠকে বিজিবি তাগাদা দিলেও জানানো হয়েছিল, এটি তাদের এখতিয়ারভুক্ত নয়।
সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, শুকনো মৌসুমে ফেনী নদীর পানির গড় পরিমাণ ৭৯৪ কিউসেক এবং বার্ষিক পানির গড় পরিমাণ প্রায় ১,৮৭৮ কিউসেক। ফলে ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার মানে শুষ্ক মৌসুমের গড় পানি প্রবাহের মাত্র ০.২৩ শতাংশ। ফলে চুক্তি অনুসারে ১.৮২ কিউসেক পানি উত্তোলন করলে ফেনী নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে কোনও প্রভাব ফেলবে না বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়। তবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, ফেনী নদীতে বর্ষা মৌসুমে ৮০০০ থেকে ১০,০০০ কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়।কিন্তু শুকনো মৌসুম অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ফেনী নদীতে ৪৭ থেকে ৫০ কিউসেক পানি থাকে।বঅথচ ২০ বছর আগে এই নদীতে শুষ্ক মৌসুমে ১২০ কিউসেক পানির প্রবাহ ছিল বলে জানিয়েছেন ওয়ারপো’র সাবেক মহাপরিচালক ইনামুল হক। অবৈধ পানি উত্তোলনই এ প্রধান কারণ বলে তিনি মনে করেন।
এমন অবস্থায় ফেনী নদী থেকে পানি কোন মৌসুমে এবং কোন অনুপাতে তোলা হচ্ছে সে বিষয়ে দুই দেশের পরিষ্কার ধারণা রাখা প্রয়োজন বলে জানান পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ আইনূন নিশাত।
বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল এবং সমতলে ফেনী জেলার দুই পাড়ের মানুষদের জীবনের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে ফেনী নদীর। বেশ কয়েকটি উপনদী এসে ফেনী নদীর সাথে মিশেছে। তাই ফেনী নদীর পানি কমে গেলে এই উপনদীগুলোতেও পানি প্রবাহ কমে যাবে। এতে নদীর জীব-বৈচিত্র্য এবং নদীর তীর সংলগ্ন বাসিন্দারা হুমকির মুখে পড়বে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
নিউজ শেয়ারঃ

আরও সংবাদ

জনপ্রিয় সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

আলোচিত সংবাদ

নিউজ শেয়ারঃ
শিরোনামঃ
Verified by MonsterInsights