আজ ২০শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ ও ৭ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ এবং ১১ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি

৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যার কারণ ‘ইন্টারনেট ব্যবহার’: আঁচল ফাউন্ডেশন

  • In শীর্ষ
  • পোস্ট টাইমঃ ১০ জুন ২০২৩ @ ০৭:৩৩ অপরাহ্ণ ও লাস্ট আপডেটঃ ১০ জুন ২০২৩@০৭:৩৩ অপরাহ্ণ
৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যার কারণ ‘ইন্টারনেট ব্যবহার’:  আঁচল ফাউন্ডেশন

।।নিজস্ব প্রতিবেদক।।

শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্বকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আচরণত পরিবর্তন, ধৈর্য্য শক্তির হ্রাস এবং একাকীত্বে ভোগাসহ নানা বিষয়ের তথ্য উঠে এসেছে আঁচল ফাউন্ডেশনের সমীক্ষায়। তাতে বলা হয়,৭২ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থীদের জীবনের কোনও না কোনও সময়ে মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থীই বলছেন, তাদের মানসিক সমস্যার পেছনে ইন্টারনেটের ভূমিকা রয়েছে। মানসিক সমস্যার কারণ হিসেবে ইন্টারনেটকে পুরোপুরি দায়ী মনে করেন ২৬ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর মোটামুটি দায়ী ভাবেন ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী।

শনিবার আঁচল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রভাব: কতটুকু সতর্ক হওয়া জরুরি’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়। অনলাইনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমীক্ষার ফলাফল তুলে ধরেন ফাউন্ডেশনের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস ইউনিটের সদস্য ফারজানা আক্তার।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সমীক্ষার কাজ হয়েছে। সমীক্ষায় ১ হাজার ৭৭৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন, যার মধ্যে নারী ৪৯ দশমিক ৫ এবং পুরুষ ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের আছেন শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ।

সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থীর বয়স ১৬ থেকে ১৯ বছর, ৭৬ দশমিক ৩ শতাংশের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছর এবং ১০ দশমিক ৫ শতাংশের বয়স ২৬ থেকে ৩০ বছর। এসব শিক্ষার্থীর ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ অপরিমিত ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।

সমীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৮দশমিক ৬ শতাংশ কলেজ পড়ুয়া, ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী, ৮ দশমিক ৪ শতাংশ স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী এবং ৮দশমিক ৭ শতাংশ চাকুরী প্রত্যাশী।

সমীক্ষা অনুসারে, ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা বিষয়ক কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকেন। ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ অবসর সময় কাটাতে, ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ যোগাযোগের প্রয়োজনে, ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ অনলাইন গেম খেলতে বা ভিডিও দেখতে, ১২ দশমিক ৬ শতাংশ অনলাইনে কেনাকাটা করতে এবং ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রয়োজনে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। জরিপ অনুসারে আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীদের বড় অংশই অফলপ্রসূ কাজে ইন্টারনেটে বেশি সময় ব্যয় করেন।

জরিপে দেখা গেছে, অপরিমিত ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী। এদের মাঝে দিনে ১১ ঘণ্টার উপরে অনলাইনে থাকেন ৬দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী। ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ জানান যে, তারা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার মত ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা ইন্টারনেটে থাকেন ৩৬.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং ৩২.৩ শতাংশ ব্যবহার করেন ২ থেকে ৪ ঘন্টার মত।

জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ জানান যে, ইন্টারনেটে সময় ব্যয় তাদের স্বাভাবিক জীবনে ‘প্রচণ্ড নেতিবাচক’ প্রভাব ফেলছে। ৫৭ দশমিক ২ শতাংশের স্বাভাবিক জীবনে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানা যায়। নেতিবাচক প্রভাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৫৯দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন ইন্টারনেটে সময় ব্যয় তাদের পড়াশোনায় মনোযোগের বিঘ্নতার জন্যে দায়ী। ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ ইন্টারনেটে পর্ন দেখা, সাইবার ক্রাইম, বাজি ধরা, বুলিং করা প্রভৃতি অপ্রীতিকর কাজের সাথে সংযুক্ত হয়ে পড়েছেন। ২৩ শতাংশ ধীরে ধীরে অন্তর্মুখী হয়ে পড়েছেন, ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ ডিপ্রেশনসহ বিভিন্ন ধরণের মানসিক চাপ অনুভব করেছেন এবং ২০দশমিক ৩ শতাংশ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন বলে সমীক্ষার ফলাফল থেকে জানা যায়।

গবেষণার তথ্য অনুসারে, ১৩ দশমিক ১ শতাংশ জানান যে, ইন্টারনেটের ব্যবহার তাদের আত্মকেন্দ্রিক করে তুলেছে। ৬দশমিক ৫ শতাংশের নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে। ২৪ শতাংশ ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবনে লক্ষ্যচ্যুত হচ্ছেন এবং ২৫দশমিক ৭ শতাংশের অফলপ্রসূ কাজে সময় নষ্ট হচ্ছে বলে জানান। এছাড়া ৫৮দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী জরিপের মাধ্যমে জানান যে, তাদের প্রতিদিন পরিমিত ঘুম হয় না। এদের মধ্যে ৩০দশমকি ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পরিমিত ঘুম না হওয়ার পেছনে তাদের ইন্টারনেট ব্যবহারকে পুরোপুরিভাবে দায়ী করেছেন। দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট ব্যবহার করার কারণে শিক্ষার্থীরা নানাবিধ শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হন বলে জানান যার মধ্যে ৫৩দশমিক ৬ শতাংশের ঘুমের অপূর্ণতা দেখা দেয়, ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশের মাথা ঝিম ঝিম ও ব্যথা অনুভূত হয়, ১৯দশমিক২ শতাংশের ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়, ২৪ দশমিক৩ শতাংশ চোখে ঝাপসা দেখে এবং ২৭দশমিক৮ শতাংশ ক্লান্তি অনুভব করেন।

সমীক্ষার ফলাফল থেকে জানা যায়, ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি বা যৌন উত্তেজক বিষয় সম্পর্কিত ওয়েবসাইট দেখেন। এছাড়া অন্যের সফলতায় ১০দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর মনে হতাশার সৃষ্টি করেছে এবং ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের সময় দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় দেখা যায়, অন্যের জীবনযাত্রার সাথে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজের জীবনযাত্রার মান তুলনা করেন। এছাড়া ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যদের দেখে নিজেকে অন্যদের তুলনায় খুব সংকীর্ণ, অযোগ্য, ব্যর্থ বা অসুখী মনে হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কার্যক্রম ২১ দশমিক ৭ শতাংশের ভেতর রাতারাতি জনপ্রিয় হওয়ার ইচ্ছে তৈরি করে। আর ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান, তাদের মনে এ ধরণের ইচ্ছে সবসময় না হলেও মাঝে মাঝে হয়ে থাকে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্বকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করছে। জরিপের তথ্য অনুসারে, ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর ধৈর্য্য শক্তির হ্রাস ঘটে, ২৬ শতাংশ হঠাৎ রেগে যান, ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ চুপচাপ হয়ে যান, ২২দশমিক ৫ শতাংশের ভেতর জড়তা তৈরি হয়, ২৪ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি হয়, ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ ঘরকুনো হয়ে যান। অন্যদিকে, ৩০ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন তারা যখন অফলাইনে থাকেন তখন একাকীত্বে ভোগেন।
জরিপের ফলাফল নিয়ে আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট তানসেন রোজ বলেন শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশ অবসর সময় কাটানোর জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। বিশ্বায়নের যুগে ইন্টারনেট ব্যবহার না করলে আমাদের তরুণ প্রজন্মই পিছিয়ে পড়বে। কিন্তু আমরা দেখে আসছি অনলাইন ভিত্তিক অপকর্ম হঠাৎ করেই বেড়ে গিয়েছে। সাইবার ক্রাইম, ব্ল্যাকমেইল করাসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে অনেক শিক্ষার্থী নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ হুমকীর মুখে ফেলছেন। এমনকি অনেকে আত্মহত্যা করতেও উৎসাহিত হন।”

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, জরিপের তথ্য অনুযায়ী কিছু কিছু ক্ষেত্রে আশঙ্কার চিত্র ফুটে উঠেছে যা আমাদের ভাবতে সহায়তা করবে আসলেই ইন্টারনেটের ব্যবহার এ বয়সী মানুষদের উপকার করছে নাকি অপকারটাই বয়ে নিয়ে আসছে। বিশেষ করে ১৯-৩০ বছর বয়সী যে তরুণ যুবক গোষ্ঠী আছে তাদের হতাশা, বিষণ্নতা এবং অন্যান্য সামাজিক-মানসিক অস্থিরতা আগের তুলনায় অনেক বেশি। এদের মধ্যে আত্মহত্যার হারও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এক্ষেত্রে ইন্টারনেট কিছুটা দায়ী বলেও প্রতীয়মান হচ্ছে।
সমস্যা সমাধানে আঁচল ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতে স্কুল, কলেজগুলোতে ডিজিটাল লিটারেসি প্রোগ্রাম চালু করাসহ ১০ দফা প্রস্তাব দেন।

নিউজ শেয়ারঃ

আরও সংবাদ

জনপ্রিয় সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

আলোচিত সংবাদ

নিউজ শেয়ারঃ
শিরোনামঃ
Verified by MonsterInsights