আজ ২৩শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ ও ৮ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ এবং ১৭ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

ইসলাম কী? ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, তার প্রমাণ কী?

  • In ধর্ম
  • পোস্ট টাইমঃ ৬ জুন ২০২৩ @ ০৩:০৬ অপরাহ্ণ ও লাস্ট আপডেটঃ ৬ জুন ২০২৩@০৩:০৬ অপরাহ্ণ
ইসলাম কী? ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, তার প্রমাণ কী?
ছবি- বিডিহেডলাইন্স

ইসলাম কি?
আসুন দেখি ইসলামের ব্যাপারে ইসলাম নিজে কি বলে-
“হে মুহাম্মাদ (সাঃ) বল, আমার রব নিঃসন্দেহে আমাকে সঠিক নির্ভূল পথ দেখাইয়া দিয়াছেন।সম্পূর্ণ ও সর্বতভাবে নির্ভূল দ্বীন, তাহাতে বক্রতার কোন স্থান নাই। ইহা ইব্রাহীমের অবলম্বিত পথ ও পন্থা, যাহা সে ঐকান্তিক নিষ্ঠা ও একমূখীতার সহিৎ গ্রহণ করেছিল এবং সে মুসলিমদের মধ্যে ছিল। বল, আমার নামায, আমার সর্বপ্রকার ইবাদত অনুষ্ঠান সমুহ, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবকিছুই সারা জাহানের রব আল্লাহর’ই জন্য।” সূরা আল-আনআম ১৬১-১৬২।

إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللّهِ الإِسْلاَمُ وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوْتُواْ الْكِتَابَ إِلاَّ مِن بَعْدِ مَا جَاءهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ وَمَن يَكْفُرْ بِآيَاتِ اللّهِ فَإِنَّ اللّهِ سَرِيعُ الْحِسَابِ

নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম। এবং যাদের প্রতি কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও ওরা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ, যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি কুফরী করে তাদের জানা উচিত যে, নিশ্চিতরূপে আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত দ্রুত। [ সুরা ইমরান ৩:১৯ ]

فَإنْ حَآجُّوكَ فَقُلْ أَسْلَمْتُ وَجْهِيَ لِلّهِ وَمَنِ اتَّبَعَنِ وَقُل لِّلَّذِينَ أُوْتُواْ الْكِتَابَ وَالأُمِّيِّينَ أَأَسْلَمْتُمْ فَإِنْ أَسْلَمُواْ فَقَدِ اهْتَدَواْ وَّإِن تَوَلَّوْاْ فَإِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلاَغُ وَاللّهُ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ

যদি তারা তোমার সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হয় তবে বলে দাও, “আমি এবং আমার অনুসরণকারীগণ আল্লাহর প্রতি আত্নসমর্পণ করেছি।” আর আহলে কিতাবদের এবং নিরক্ষরদের বলে দাও যে, তোমরাও কি আত্নসমর্পণ করেছ? তখন যদি তারা আত্নসমর্পণ করে, তবে সরল পথ প্রাপ্ত হলো, আর যদি মুখ ঘুরিয়ে নেয়, তাহলে তোমার দায়িত্ব হলো শুধু পৌছে দেয়া। আর আল্লাহর দৃষ্টিতে রয়েছে সকল বান্দা। [ সুরা ইমরান ৩:২০ ]

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, তার প্রমাণ –
একঃ ইসলাম-ই পৃথিবীর সর্বপ্রথম জীবন ব্যবস্থা
ইসলাম দাবি করে মানুষের আদি পিতা আদম এবং আদি মাতা হাওয়া। এবং তাদেরকে বেহেস্ত থেকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে।

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلاَئِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الأَرْضِ خَلِيفَةً قَالُواْ أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاء وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لاَ تَعْلَمُونَ

আর তোমার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদিগকে বললেনঃ আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি, তখন ফেরেশতাগণ বলল, তুমি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবে যে দাঙ্গা-হাঙ্ গামার সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা নিয়ত তোমার গুণকীর্তন করছি এবং তোমার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না। [ সুরা বাকারা ২:৩০ ]

قُلْنَا اهْبِطُواْ مِنْهَا جَمِيعاً فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلاَ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَ هُمْ يَحْزَنُونَ

আমি হুকুম করলাম, তোমরা সবাই নীচে নেমে যাও। অতঃপর যদি তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে কোন হেদায়েত পৌঁছে, তবে যে ব্যক্তি আমার সে হেদায়েত অনুসারে চলবে, তার উপর না কোন ভয় আসবে, না (কোন কারণে) তারা চিন্তাগ্রস্ত ও সন্তপ্ত হবে। [ সুরা বাকারা ২:৩৮ ]

قَالَ فِيهَا تَحْيَوْنَ وَفِيهَا تَمُوتُونَ وَمِنْهَا تُخْرَجُونَ

বললেনঃ তোমরা সেখানেই জীবিত থাকবে, সেখানেই মৃত্যুবরন করবে এবং সেখান থেকেই পুনরুঙ্খিত হবে। [ সুরা আরাফ ৭:২৫ ]

এই প্রথম মানব মানবীর বিশ্বাস অন্যান্য আব্রাহামিক ধর্ম (ইব্রাহিমীয় ধর্ম বা আব্রাহামীয় ধর্ম (ইংরেজি: Abrahamic Religion) বলতে একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোকে বোঝানো হয়, যাদের মধ্যে আব্রাহাম বা ইব্রাহিমের সাথে সম্পর্কিত ধর্মীয় উৎপত্তি[১] অথবা ধর্মীয় ইতিহাসগত ধারাবাহিকতা বিদ্যমান।[২][৩][৪] সূচনালগ্ন অনুসারে ক্রমবিন্যাস করলে প্রধান তিনটি ইব্রাহিমীয় ধর্ম হচ্ছে- ইহুদী ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, এবং ইসলাম। [৬]) অনুসারীরাও বিশ্বাস করেন।

মার্কিন পরিবেশবিদ এলিস সিলভারের নতুন বই ‘হিউম্যানস আর নট ফ্রম আর্থ: আ সায়েন্টিফিক ইভোলিউশন অফ দ্য এভিডেন্স’-এ দাবি করেছেন, মানুষ পৃথিবীর জীবই নয়৷ ভিনগ্রহের প্রাণী৷ বহু বছর আগে ভিনগ্রহের কিছু প্রাণী পৃথিবীতে এসেছিল ৷ তাদের সঙ্গেই নাকি পৃথিবীতে আসে মানুষ৷ জনাকয়েক মানুষ এ গ্রহে রেখে বাকিরা নিজেদের গ্রহে ফিরে যায়৷

এলিসের দাবি, কম মাধ্যাকর্ষণ শক্তিবিশিষ্ট কোনও গ্রহেই জন্ম মানুষের৷ তাই পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না তারা৷ অধিকাংশ মানুষই তাই পিঠ ও কোমর ব্যথায় কাবু৷

إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ

নিশ্চয় খোদাভীরুরা বাগান ও নির্ঝরিনীসহূহে থাকবে। [ সুরা হিজর ১৫:৪৫ ]

لاَ يَمَسُّهُمْ فِيهَا نَصَبٌ وَمَا هُم مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ

সেখানে তাদের মোটেই কষ্ট হবে না এবং তারা সেখান থেকে বহিস্কৃত হবে না। [ সুরা হিজর ১৫:৪৮ ]

এলিসের কথায়, ‘ভিনগ্রহের উন্নত প্রজাতিকে পৃথিবীতে আনা হয়েছিল, তাই মানুষই এই গ্রহের সবচেয়ে উন্নত জীব৷ কিন্তু পৃথিবীর পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি তারা৷ সূর্যের আলোয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ প্রকৃতির বুকে স্বাভাবিক ভাবে যে সমস্ত খাবার-দাবার পাওয়া যায়, তা মানুষের পছন্দ হয় না৷ খুব সহজেই ক্রনিক রোগে আক্রান্তও হয়ে পড়ে৷’

لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ

আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতর অবয়বে। [ সুরা তীন ৯৫:৪ ]

ثُمَّ رَدَدْنَاهُ أَسْفَلَ سَافِلِينَ

অতঃপর তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি নীচ থেকে নীচে। [ সুরা তীন ৯৫:৫ ]

إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَلَهُمْ أَجْرٌ غَيْرُ مَمْنُونٍ

কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্যে রয়েছে অশেষ পুরস্কার। [ সুরা তীন ৯৫:৬ ]

এলিসের দাবি, ভিনগ্রহের প্রাণী বলেই পৃথিবীর পরিবেশের সঙ্গে তারা মানিয়ে নিতে পারে না৷ দেখা দেয় সমস্যা৷ এমনকি মানুষের বডিক্লক দিনে ২৫ ঘণ্টার ভিত্তিতে তৈরি৷ পৃথিবীর সময়ের হিসেবের সঙ্গে তা মেলে না বলেই প্রায়শই অসুস্থ হয়ে পড়ে মানুষ৷ এলিসের দাবি, মানবজাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও মিলবে তার প্রমাণ৷

‘উন্নত প্রজাতি’র মানুষকে তবে হঠাত্‍ ‘কম উন্নত’ গ্রহে এনে ছেড়ে দেওয়া হল কেন? এলিসের যুক্তি, পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব অনেকটাই দ্বীপান্তরে নির্বাসনের মতো৷ তাঁর কথায়, ‘ভিনগ্রহের প্রাণীদের কাছে পৃথিবী অনেকটা জেলের মতো৷ প্রকৃতিগত ভাবে মানুষ খুবই হিংস্র৷ তাই সঠিক আচার-আচরণ শিখতেই পৃথিবীতে নির্বাসনে পাঠানো হয় তাদের৷’

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلاَئِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الأَرْضِ خَلِيفَةً قَالُواْ أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاء وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لاَ تَعْلَمُونَ

আর তোমার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদিগকে বললেনঃ আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি, তখন ফেরেশতাগণ বলল, তুমি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবে যে দাঙ্গা-হাঙ্ গামার সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা নিয়ত তোমার গুণকীর্তন করছি এবং তোমার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না। [ সুরা বাকারা ২:৩০ ]

এলিসের এই বই যে বিতর্ক তৈরি করবে, সে বিষয়েও ওয়াকিবহাল এই মার্কিন পরিবেশবিদ৷ বিতর্ককে রীতিমতো স্বাগতও জানিয়েছেন তিনি৷ এলিসের ধারণা, তাঁর তথ্যকেই সত্যি বলে ধরে না নিয়ে মানুষ যদি তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে, তবে তাঁর দাবির স্বপক্ষে আরও প্রমাণ মিলতে পারে৷ খুলে যেতে পারে বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্তও৷

দুইঃ আল্লাহ সবকিছু সুবিন্যস্ত করেছেন পরিমিতভাবে (সুপার স্ট্রিং থিউরি)

মহাবিশ্বকে বুঝার জন্য পদার্থ বিজ্ঞানের দুইটি অতি সফল তত্ত্ব হল

(i) আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব এবং (ii) কোয়ান্টাম মেকানিক্স।

আপেক্ষিক তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে কীভাবে বৃহৎ স্কেলে মহাকর্ষ বল কাজ করে থাকে, অপরদিকে কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যাখ্যা করে থাকে কীভাবে ক্ষুদ্রতম স্কেলে অপর তিনটি মৌলিক বল যথা, শক্তিশালী নিউক্লীয় বল, দুর্বল নিউক্লীয় বল ও তাড়িৎ-চুম্বকীয় বল কাজ করে থাকে।

উপরোক্ত দুইটি তত্ত্ব একই স্পেস-টাইম (spacetime)-কে দুইটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে।

এই অসংগতি দূর করার জন্য এবং উপরে উল্লেখিত চারটি মৌলিক বল কীভাবে কাজ করে থাকে, তারা একটি মাত্র বলের ভিন্ন ভিন্ন বহিঃপ্রকাশ কী না, তা ব্যাখ্যা করার জন্যই স্ট্রিং থিউরির অবতারণা করা হয়েছে। স্ট্রিং থিউরি অনুযায়ী, বিশ্ব জগত সৃষ্টিকারী সমস্ত মৌলিক কণিকা অর্থাৎ কোয়ার্ক, লেপটন, গেজ বোসন ইত্যাদি মূলত স্ট্রিং ছাড়া আর কিছুই নয়।

তবে এগুলো আমাদের দেখা স্ট্রিং যেমন তার বা গুনা জাতীয় কিছু নয়।

এগুলো হল এনার্জি বা শক্তির স্ট্রিং যেগুলো বিভিন্ন কম্পাংকে কম্পিত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন মৌলিক কণিকাসমূহ তৈরি করছে। পার্টিকেল ফিজিক্স থেকে আমরা জানি, একেবারে গভীরের জিনিসটি হল কতগুলো অবিভাজ্য কণিকা যাদের দ্বারা সমগ্র মহাবিশ্ব তৈরি।

এদেরকে বলা হয়ে থাকে “প্রাথমিক মৌলিক কণিকা”।

এই মৌলিক কণিকাগুলির মধ্যে এক প্রজাতি পদার্থ গঠনে অংশগ্রহণ করে থাকে, যাদেরকে বলা হয় পদার্থ গঠনকারী কণিকা, অন্য নাম ফার্মিয়ন (উদাহরণঃ ইলেকট্রন, সমস্ত কোয়ার্ক। কোয়ার্ক বলাতে প্রোটন ও নিউট্রনকে আর আলাদাভাবে বললাম না কারণ প্রোটন, নিউট্রন মূলত কোয়ার্ক দ্বারা তৈরি। বাদ বাকি লেপটন সমূহও এই শ্রেণীর অন্তর্গত)।

দ্বিতীয় প্রজাতির কণিকাসমূহ মৌলিক বল সমূহের বাহনকারী হিসেবে কাজ করে থাকে, এদেরকে বলা হয় বল বাহনকারী কণিকা, অন্য নাম গেজ বোসন (উদাহরণঃ সাধারণ আলোক কণিকা/ফোটন, গ্লুয়োন ইত্যাদি)।

কণা বিজ্ঞানে আপাতত এগুলোকেই ধরা হয় সবচেয়ে ছোট কণিকা যাদেরকে এখনও পর্যন্ত আর ভাগ করা সম্ভব হয় নি। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানীই ধারণা করে থাকেন যে, এতগুলি মৌলিক কণিকার পরিবর্তে হয়ত শুধু একটিমাত্র ক্ষুদ্রতম জিনিস রয়েছে যার থেকে সমস্ত কিছুর উৎপত্তি। স্ট্রিং থিউরি অনুযায়ী ক্ষুদ্রতম ঐ একটিমাত্র জিনিসই হল এনার্জি বা শক্তির স্ট্রিং যার দ্বারা এই সমগ্র মহাবিশ্ব গঠিত।

আমাদের মোটামুটি সবারই জানা আছে যে নিউট্রনের ভর প্রোটনের ভর থেকে সামান্য বেশি, প্রায় শতকরা ০.১ ভাগ বেশি।

অর্থাৎ প্রোটনের ভর যদি হয় ১০০ গ্রাম, নিউট্রনের ভর হল প্রায় ১০০.১ গ্রাম (নিউট্রনের প্রকৃত ভর হল ১.৬৭৫০×১০^-২৪ গ্রাম, অপর দিকে প্রোটনের প্রকৃত ভর হল ১.৬৭২৭×১০-২৪ গ্রাম)। নিউট্রনের ভর এই সামান্য বেশি না হলে আপনি, আমি, কেউ-ই আজ এইখানে থাকতাম না। এতটুকু ভর বেশি না হলে সৃষ্টি হত না কোন পৃথিবী, চাদ, তারা, সূর্য, অন্যান্য নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ। প্রাণীকূলের কথা তো অনেক পরের ব্যাপার। যদি প্রোটনের ভর নিউট্রনের ভর থেকে সামান্য বেশি হত, তাহলে বিগ ব্যাং-এর (অর্থাৎ মহাবিশ্ব সৃষ্টির) কয়েক মিনিট পরে সব প্রোটন ভেংগে নিউট্রনে রূপান্তরিত হত (যেরকমটি এখন আমরা দেখতে পাই একটি ফ্রি নিউট্রন গড়ে প্রায় ১৫ মিনিট পরে ভেংগে প্রোটনে রূপান্তরিত হয়), ফলে আদি মহাবিশ্ব পরিপূর্ণ থাকত শুধুমাত্র নিউট্রনে, ফলাফলস্বরূপ কোন হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম পরমানু তৈরি হত না। হাইড্রোজেন তৈরি না হলে কোন নক্ষত্রই তৈরি হত না, তৈরি হত না পৃথিবীর মত কোন গ্রহ, চাদের মত কোন উপগ্রহ।

অর্থাৎ এই সামান্য ভর বেশি না হলে আমরা যে মহাবিশ্ব দেখছি, এই মহাবিশ্বই এরূপ সৃষ্টি হত না, একেবারে সম্পূর্ণ ভিন্ন মহাবিশ্ব তৈরি হত, সেখানে মানুষ নামক কোন প্রানীরই অস্তিত্ব থাকত না।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে একটা মহাবিশ্বে বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষ আসতে হলে তাকে কতগুলো স্পেসিফিক সূত্রাবলির (ফিজিক্সের সূত্রাবলির) একফোটাও বাইরে যাবার কোন উপায় নেই।

অনেকেই এটাকে বলে থাকে ” ফাইন টিউনিং বা খুব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সমন্বয় (Fine tuning)” এবং ধারণা করে থাকে এই ক্ষেত্রে কোন অতি বুদ্ধিমান সত্তার (যেটাকে আমরা সৃষ্টিকর্তা বলে থাকি) হয়ত হাত রয়েছে।

স্রষ্টার ধারণা মূলত এখান থেকেই অনেকে অবতারণা করে থাকে।

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى

আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামের পবিত্রতা বর্ণনা করুন [ সুরা আ’লা ৮৭:১ ]

الَّذِي خَلَقَ فَسَوَّى

যিনি সৃষ্টি করেছেন ও সুবিন্যস্ত করেছেন। [ সুরা আ’লা ৮৭:২ ]

وَالَّذِي قَدَّرَ فَهَدَى

এবং যিনি সুপরিমিত করেছেন ও পথ প্রদর্শন করেছেন [ সুরা আ’লা ৮৭:৩ ]

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ وَالسَّمَاء وَالطَّارِقِ

শপথ আকাশের এবং রাত্রিতে আগমনকারীর। [ সুরা তারিক ৮৬:১ ]

وَمَا أَدْرَاكَ مَا الطَّارِقُ

আপনি জানেন, যে রাত্রিতে আসে সেটা কি? [ সুরা তারিক ৮৬:২ ]

النَّجْمُ الثَّاقِبُ

সেটা এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। [ সুরা তারিক ৮৬:৩ ]

إِن كُلُّ نَفْسٍ لَّمَّا عَلَيْهَا حَافِظٌ

প্রত্যেকের উপর একজন তত্ত্বাবধায়ক রয়েছে। [ সুরা তারিক ৮৬:৪ ]

তিনঃ মাল্টি ইউনিভার্স

স্ট্রিং থিউরি মূলত কাজ করে থাকে ১১ ডাইমেনশনাল মহাবিশ্বে, যাদের ভিতর ১০ টি হল স্পেস বা স্থান সংক্রান্ত ডাইমেনশন এবং বাকী একটি হল “সময় বা টাইম” সংক্রান্ত ডাইমেনশন।

আমাদের অতি পরিচিত প্রথম তিনটি ডাইমেনশন অর্থাৎ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা বাদে অবশিষ্ট ৭ টি স্থান সংক্রান্ত ডাইমেনশন এতই ছোট যে (প্লাংক দৈর্ঘ্য-এর সমমানের, ১০^-৩৫ মিটার) এরা সংকুচিত হয়ে আমাদের চারপাশের স্থানের প্রতিটি বিন্দুতে অবস্থান করছে, যাদেরকে আমরা খালি চোখে দেখতে পারি না।

শুধুমাত্র সুপার স্ট্রিংগুলিই ওইসব উচ্চতর ডাইমেনশনে বিচরণের ক্ষমতা রাখে এবং সেখানে এরা বিভিন্ন ভাইব্রেশন মুডে কম্পিত হয়ে বিভিন্ন মৌলিক কণিকা এবং বলকে আমাদের সামনে উন্মুক্ত করছে।

উপরে উল্লেখিত উচ্চতর ডাইমেনশন থেকেই মূলত “মাল্টিভার্স” বা “বহু মহাবিশ্ব” ধারণার উৎপত্তি।

অর্থাৎ যদি উচ্চতর ডাইমেনশনগুলি সত্যিই বিরাজ করে থাকে (যা লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার গবেষণাগারে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণের জন্য চেস্টা চলছে), তাহলে এটা নিশ্চিত হওয়া যাবে যে আমাদের মহাবিশ্ব বাদেও রয়েছে অগণিত মহাবিশ্ব।

আমাদের মহাবিশ্ব হল তাদের মধ্যে একটি।

হয়ত বা ঐসব মহাবিশ্বের যে কোন দুটির সংঘর্ষই ছিল বিগব্যাং যার মাধ্যমে আমাদের মহাবিশ্ব আজ থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে জন্মগ্রহণ করে যাত্রা শুরু করেছিল।

اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ يَتَنَزَّلُ الْأَمْرُ بَيْنَهُنَّ لِتَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ وَأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا

আল্লাহ সপ্তাকাশ সৃষ্টি করেছেন এবং পৃথিবীও সেই পরিমাণে, এসবের মধ্যে তাঁর আদেশ অবতীর্ণ হয়, যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং সবকিছু তাঁর গোচরীভূত। [ সুরা তালাক ৬৫:১২ ]

উচ্চতর ডাইমেনশনগুলির অস্তিত্ব প্রমাণিত হলে বিজ্ঞানের আরো কিছু রহস্যময় জটিল প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

এর মধ্যে একটি হল, পদার্থ বিজ্ঞানে রয়েছে কতগুলো মৌলিক ধ্রুবক সংখ্যা (প্রায় ২০ টি, যেমন ইলেকট্রনের ভর, মহাকর্ষীয় ধ্রুবক ইত্যাদি) যেগুলো গভীর থেকে ভূমিকা রেখে আমাদের মহাবিশ্বকে খুব সুচারুভাবে পরিচালনা করে চলেছে।

এদের একটির মানও সামান্য হেরফের হলে আমাদের মহাবিশ্ব বিরাজ করত না, জন্মও নিত না।

কিন্তু কেউই জানে না এই সংখ্যাগুলো কেন ঐ বিশেষ মানকেই বেছে নিয়েছে।

إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ

আমি প্রত্যেক বস্তুকে পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি। [ সুরা ক্বামার ৫৪:৪৯ ]

চারঃ মাতৃগর্ভে জন্ম

একজন মহিলার গর্ভধারণ থেকে শিশুজন্মের মাঝে মোট সময় মোটামুটি ৪০ সপ্তাহ। সর্বশেষ স্বাভাবিক মাসিক (মেনসচুরাল পিরিয়ড) থেকে সাধারণত সময়টি গননা করা হয়। দিনের হিসেবে বলা যেতে পারে ২৫০ থেকে ২৮৫ দিন । মোট সময়কালকে তিনটি ট্রাইমেস্টারে ভাগ করা হয়; ১ম, ২য় ও ৩য় ট্রাইমেস্টার। গর্ভধারনের ১ম থেকে ১৩ সপ্তাহকে ধরা হয় ১ম ট্রাইমেস্টার। ২য় ট্রাইমেস্টার ১৪ থেকে ২৬ সপ্তাহ এবং ৩য় ট্রাইমেস্টার ২৭ সপ্তাহ থেকে বাচ্চা জন্মের আগ পর্যন্ত সময়কাল।

প্রথম তিন মাসে ভ্রূণের বৃদ্ধি :

আমেরিকান কলেজ অফ অবসটেট্রিশিয়ান এন্ড গাইনেকোলজিস্ট (ACOG) এর মতে, গর্ভাবস্থার প্রথম মাসে বাচ্চার হৃদপিণ্ড ও ফুসফুসের গঠন হওয়া শুরু হয়। এই সময়েই বেবির হাত, পা, মস্তিষ্ক, স্নায়ুরজ্জু এবং স্নায়ুর গঠন ও শুরু হয়ে যায়।

ভ্রূণের আকার তখন হয় একটি মটর দানার মত। দ্বিতীয় মাসে ভ্রূণের আকার বৃদ্ধি পেয়ে শিমের বিচির মত হয়। গোড়ালি, কব্জি, আঙ্গুল ও চোখের পাতা গঠিত হয়। হাড়ের প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে যৌনাঙ্গ এবং অন্তঃকর্ণ এরও বিকাশ শুরু হয়।

দ্বিতীয় মাসের শেষের দিকে ভ্রনের ৮-১০ টি প্রধান অঙ্গ গঠিত হয়। গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসেই গর্ভপাত হয় ও ভ্রূণের জন্মগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে। তাই এই সময়ে ক্ষতিকর কোন ঔষধ গ্রহণ করা উচিৎ নয়।

গর্ভাবস্থার তৃতীয় মাসে হাড় ও পেশীর বৃদ্ধি শুরু হয়। ভবিষ্যৎ দাঁতের জন্য ভিত্তি তৈরি হয় এবং হাত ও পায়ের আঙ্গুলের বৃদ্ধি হয়। এই সময়ে অন্ত্রের গঠন শুরু হয় এবং ভ্রূণের ত্বক প্রায় স্বচ্ছ থাকে।

দ্বিতীয় তিন মাসে ভ্রূণের বৃদ্ধি :

গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় তিন মাসে গর্ভস্থ ভ্রূণের অনেকটা বৃদ্ধি হয়। এই সময়ে ভ্রুন ৩-৫ ইঞ্চি লম্বা হয়। যদি হবু বাবা-মা আগাম জানতে চান তাহলে ১৮-২২ সপ্তাহে আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ভ্রূণের লিঙ্গ জানা যায়।

গর্ভাবস্থার ৪ মাসের সময় ভ্রু, পাপড়ি, নখ এবং ঘাড় গঠিত হয়। এই সময়ে ভ্রূণের ত্বক কুঞ্চিত থাকে এবং হাত ও পা বাঁকা করতে পারে। কিডনি কাজ করা শুরু করে এবং প্রস্রাব উৎপাদন করতে পারে। গর্ভস্থ শিশু ঢোক গিলতে এবং শুনতে পারে।

পঞ্চম মাসে ভ্রুন সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং মা তার নড়াচড়া অনুভব করতে পারেন। এই সময়ে গর্ভস্থ শিশু নিয়মিত সময়ে ঘুমায় ও জেগে উঠে। সূক্ষ্ম লোম গজায় যাকে ল্যানুগো বলে এবং ভ্রূণের ত্বকের সুরক্ষায় মোমের আবরণ তৈরি হয়, যাকে ভারনিক্স বলে।

ছয় মাসে ভ্রূণের চুল উৎপন্ন হওয়া শুরু হয়, চোখ খোলা শুরু করে এবং মস্তিষ্কের বিকাশ খুব দ্রুত হয়। ফুসফুস পুরোপুরি গঠিত হয়ে গেলেও কাজ করা শুরু করেনা।

শেষ তিন মাসে ভ্রূণের বৃদ্ধি :

গর্ভাবস্থায় সপ্তম মাসে গর্ভস্থ শিশু পদাঘাত করে এবং আলো ও শব্দের প্রতি প্রতিক্রিয়াশীল হয়। সে চোখ খোলে ও বন্ধ করে।

গর্ভস্থ শিশুর শরীরে অত্যাবশ্যকীয় খনিজ আয়রন ও ক্যালসিয়াম সংরক্ষণ শুরু হয়ে যায়। ল্যানুগো পড়ে যাওয়া শুরু হয়।

আট মাসের সময় ভ্রুন খুব দ্রুতই ওজন লাভ করে। শরীরের হার শক্ত হতে থাকলেও মাথার খুলি নমনীয় থাকে প্রসব সহজ হওয়ার জন্য। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চল গঠিত হয় এবং ভ্রুন হেঁচকি তুলতে পারে।

শিশুর দেহের মোমের আবরণ বা ভারনিক্স মোটা হতে থাকে। গর্ভস্থ শিশুর শরীরে ফ্যাট বৃদ্ধি পায়। ফলে তার আকার বড় হতে থাকে এবং নড়াচড়া করার স্থান কমে যায়। নড়াচড়ার গতি কমে গেলেও মা নড়াচড়া অনুভব করতে পারেন ঠিকই।

নবম মাসে ভ্রূণের আবাসস্থল প্রসারিত হয় এবং জন্মের জন্য ভ্রুনের মাথা শ্রোণি অঞ্চলের নীচের দিকে ঘুরে যায় (হেড ডাউন পজিশন)। ফুসফুস তার কাজ পরিচালনার জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়ে যায়। ভ্রূণের ওজন দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। জন্মের সময় বাচ্চার ওজন ৬ পাউন্ড ২ আউন্স বা ৯ পাউন্ড ২ আউন্স থাকতে পারে এবং বাচ্চা ১৯-২১ ইঞ্চি লম্বা হতে পারে।

‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির উপাদান থেকে। তারপর তাকে স্খলিত বিন্দুরূপে এক সংরক্ষিত স্থানে রাখি। এরপর আমি সেই বিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করি। অতঃপর সেই জমাট রক্তকে গোশতপিণ্ড বানিয়ে দিই। পরে সেই গোশতপিণ্ডকে অস্থিতে রূপান্তরিত করি। এরপর অস্থিরাজিতে গোশতের আচ্ছাদন লাগিয়ে দিই। পর্যায়ক্রমে তাকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টিরূপে। সুতরাং আল্লাহ বড়ই মহিমাময়, যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকর্তা।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১২-১৪)

আলোচ্য আয়াতসমূহে মানব সৃষ্টির সাতটি স্তর উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বপ্রথম স্তর মৃত্তিকার সারাংশ, দ্বিতীয় স্তর বীর্য, তৃতীয় স্তর জমাট রক্ত, চতুর্থ স্তর মাংসপিণ্ড, পঞ্চম স্তর অস্থি-পিঞ্জর, ষষ্ঠ স্তর অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃতকরণ ও সপ্তম সৃষ্টিটির পূর্ণত্ব, অর্থাৎ তাতে রুহ সঞ্চারকরণ। আল্লাহ তাআলা কোরআনে এ শেষোক্ত স্তরকে এক বিশেষ ও স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে বর্ণনা করে বলেছেন, ‘তারপর আমরা তাকে এক বিশেষ ধরনের সৃষ্টি দান করেছি।’ এই বিশেষ বর্ণনার কারণ এই যে প্রথমোক্ত ছয় স্তরে সে পূর্ণত্ব লাভ করেনি। শেষ স্তরে এসে সে সম্পূর্ণ এক মানুষে পরিণত হয়েছে। এ কথাই বিভিন্ন তাফসিরকারক বলেছেন। তাঁরা বলেন, এ স্তরে এসে তার মধ্যে আল্লাহ তাআলা ‘রুহ সঞ্চার’ করেছেন। (ইবনে কাসির)

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন, ‘তোমাদের সৃষ্টি করেছি তোমাদের মাতৃগর্ভে পর্যায়ক্রমে একের পর এক ত্রিবিধ অন্ধকারে।’ (সুরা জুমার, আয়াত : ৬)

পবিত্র কোরআনে ঘোষিত এ ত্রিবিধ অন্ধকার সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান বলে, এর একটি হচ্ছে জরায়ু, আরেকটি হচ্ছে গর্ভফুল, আর অপরটি হচ্ছে মায়ের পেট। জরায়ুতে রক্তপিণ্ড তৈরি হয়। তারপর গর্ভফুল মায়ের শরীরের রক্ত থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে ভ্রূণ বৃদ্ধি ও মায়ের ফুসফুসের মাধ্যমে প্রবেশ করা জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হওয়া থেকে ভ্রূণকে রক্ষা করে থাকে।

এভাবেই মহান রবের অপার মহিমায় একটি শিশু মায়ের জরায়ুতে বেড়ে উঠতে থাকে। আর ১২০ দিন অতিবাহিত হলেই তাতে রুহ সঞ্চারণ করে দেওয়া হয়। ফলে সে নড়াচড়া শুরু করে। আঙুল চুষতে শুরু করে। অতঃপর সে যখন পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে তখন তাকে মায়ের পেট থেকে বাহিরে ঠেলে দেওয়া হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘শুক্রবিন্দু থেকে, তিনি তাকে সৃষ্টি করেন, পরে তার পরিমিত বিকাশ সাধন করেন, তারপর তার জন্য পথ সহজ করে দেন।’ (সুরা আবাসা : আয়াত ১৯-২০)

সন্তান যখন ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় হয় তখন Overy-Placenta থেকে এক ধরনের গ্রন্থিরস নির্গত হয়। যা প্রসব পথ পিচ্ছিল ও জরায়ুর মুখ ঢিলা করে দেয়।

পাঁচঃ ইবরাহীম (আঃ) ও মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা

ইবরাহীম আঃ জন্মে ছিলেন এক মূর্তি উপাসকের ঘরে। তাঁর স্বাভাবিক মন তাঁকে প্রশ্ন করতে শুরু করে মূর্তি পূজার যৌক্তিকতা নিয়ে এবং প্রকৃত উপাস্যে অস্তিত্ব নিয়ে।

وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ إِبْرَاهِيمَ

আর তাদেরকে ইব্রাহীমের বৃত্তান্ত শুনিয়ে দিন। [ সুরা শু’য়ারা ২৬:৬৯ ]

إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَا تَعْبُدُونَ

যখন তাঁর পিতাকে এবং তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন, তোমরা কিসের এবাদত কর? [ সুরা শু’য়ারা ২৬:৭০ ]

قَالُوا نَعْبُدُ أَصْنَامًا فَنَظَلُّ لَهَا عَاكِفِينَ

তারা বলল, আমরা প্রতিমার পূজা করি এবং সারাদিন এদেরকেই নিষ্ঠার সাথে আঁকড়ে থাকি। [ সুরা শু’য়ারা ২৬:৭১ ]

قَالَ هَلْ يَسْمَعُونَكُمْ إِذْ تَدْعُونَ

ইব্রাহীম (আঃ) বললেন, তোমরা যখন আহবান কর, তখন তারা শোনে কি? [ সুরা শু’য়ারা ২৬:৭২ ]

أَوْ يَنفَعُونَكُمْ أَوْ يَضُرُّونَ

অথবা তারা কি তোমাদের উপকার কিংবা ক্ষতি করতে পারে? [ সুরা শু’য়ারা ২৬:৭৩ ]

قَالُوا بَلْ وَجَدْنَا آبَاءنَا كَذَلِكَ يَفْعَلُونَ

তারা বললঃ না, তবে আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছি, তারা এরূপই করত। [ সুরা শু’য়ারা ২৬:৭৪ ]

قَالَ أَفَرَأَيْتُم مَّا كُنتُمْ تَعْبُدُونَ

ইব্রাহীম বললেন, তোমরা কি তাদের সম্পর্কে ভেবে দেখেছ, যাদের পূজা করে আসছ। [ সুরা শু’য়ারা ২৬:৭৫ ]

أَنتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ

তোমরা এবং তোমাদের পূর্ববর্তী পিতৃপুরুষেরা ? [ সুরা শু’য়ারা ২৬:৭৬ ]

فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِّي إِلَّا رَبَّ الْعَالَمِينَ

বিশ্বপালনকর্তা ব্যতীত তারা সবাই আমার শত্রু। [ সুরা শু’য়ারা ২৬:৭৭ ]

الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ

যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনিই আমাকে পথপ্রদর্শন করেন, [ সুরা শু’য়ারা ২৬:৭৮ ]

এরপর তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান।

وَكَذَلِكَ نُرِي إِبْرَاهِيمَ مَلَكُوتَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ وَلِيَكُونَ مِنَ الْمُوقِنِينَ

আমি এরূপ ভাবেই ইব্রাহীমকে নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলের অত্যাশ্চর্য বস্তুসমূহ দেখাতে লাগলাম-যাতে সে দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে যায়। [ সুরা আন’য়াম ৬:৭৫ ]

فَلَمَّا جَنَّ عَلَيْهِ اللَّيْلُ رَأَى كَوْكَبًا قَالَ هَـذَا رَبِّي فَلَمَّا أَفَلَ قَالَ لا أُحِبُّ الآفِلِينَ

অনন্তর যখন রজনীর অন্ধকার তার উপর সমাচ্ছন্ন হল, তখন সে একটি তারকা দেখতে পেল, বললঃ ইহা আমার প্রতিপালক। অতঃপর যখন তা অস্তমিত হল তখন বললঃ আমি অস্তগামীদেরকে ভালবাসি না। [ সুরা আন’য়াম ৬:৭৬ ]

فَلَمَّا رَأَى الْقَمَرَ بَازِغًا قَالَ هَـذَا رَبِّي فَلَمَّا أَفَلَ قَالَ لَئِن لَّمْ يَهْدِنِي رَبِّي لأكُونَنَّ مِنَ الْقَوْمِ الضَّالِّينَ

অতঃপর যখন চন্দ্রকে ঝলমল করতে দেখল, বললঃ এটি আমার প্রতিপালক। অনন্তর যখন তা অদৃশ্য হয়ে গেল, তখন বলল যদি আমার প্রতিপালক আমাকে পথ-প্রদর্শন না করেন, তবে অবশ্যই আমি বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। [ সুরা আন’য়াম ৬:৭৭ ]

فَلَمَّا رَأَى الشَّمْسَ بَازِغَةً قَالَ هَـذَا رَبِّي هَـذَا أَكْبَرُ فَلَمَّا أَفَلَتْ قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي بَرِيءٌ مِّمَّا تُشْرِكُونَ

অতঃপর যখন সূর্যকে চকচক করতে দেখল, বললঃ এটি আমার পালনকর্তা, এটি বৃহত্তর। অতপর যখন তা ডুবে গেল, তখন বলল হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যেসব বিষয়কে শরীক কর, আমি ওসব থেকে মুক্ত। [ সুরা আন’য়াম ৬:৭৮ ]

إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَاْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ

আমি এক মুখী হয়ে স্বীয় আনন ঐ সত্তার দিকে করেছি, যিনি নভোমন্ডল ও ভুমন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরেক নই। [ সুরা আন’য়াম ৬:৭৯ ]

وَحَآجَّهُ قَوْمُهُ قَالَ أَتُحَاجُّونِّي فِي اللّهِ وَقَدْ هَدَانِ وَلاَ أَخَافُ مَا تُشْرِكُونَ بِهِ إِلاَّ أَن يَشَاء رَبِّي شَيْئًا وَسِعَ رَبِّي كُلَّ شَيْءٍ عِلْمًا أَفَلاَ تَتَذَكَّرُونَ

তাঁর সাথে তার সম্প্রদায় বিতর্ক করল। সে বললঃ তোমরা কি আমার সাথে আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে বিতর্ক করছ; অথচ তিনি আমাকে পথ প্রদর্শন করেছেন। তোমরা যাদেরকে শরীক কর, আমি তাদেরকে ভয় করি না তবে আমার পালকর্তাই যদি কোন কষ্ট দিতে চান। আমার পালনকর্তাই প্রত্যেক বস্তুকে স্বীয় জ্ঞান দ্বারা বেষ্টন করে আছেন। তোমরা কি চিন্তা কর না ? [ সুরা আন’য়াম ৬:৮০ ]

আর এভাবেই তিনি স্রষ্টাকে খুঁজে পান।

ছয়ঃ ইসলামী শরীয়ত কালোত্তীর্ণ

ইসলামী শরীয়ত হল – আল্লাহ তাআলার’র হুকুম (যা ওহী সুত্রে কুরআন আকারে নাজিল হয়েছে) এবং মুহাম্মাদ সাঃ-এর শরয়ী ব্যাখ্যা (যা তাঁর উপর সুন্নাহ বা আদর্শ হিসেবে ওহী সুত্রে নাজিল হয়েছে) -এই দুইয়ের সামষ্টিক রূপ।

وَ أَنزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ

‘‘আর (হে নবী মুহাম্মাদ!) আল্লাহ তোমার কাছে নাজিল করেছেন আল-কিতাব (কুরআন) এবং হিকমাহ্ (সুন্নাহ)’। [সূরা নিসা ১১৩]

وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمَا أَنزَلَ عَلَيْكُم مِّنَ الْكِتَابِ وَالْحِكْمَةِ يَعِظُكُم بِهِ

‘তোমরা তোমাদের উপর আল্লাহ’র অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো এবং (স্মরণ করো) আল-কিতাব (কুরআন) ও হিকমাহ (সুন্নাহ) হতে তোমাদের উপর যা নাজিল করেছেন, যা দিয়ে তোমাদেরকে উপদেশ দান করা হয়’। [সূরা বাকারাহ ২৩১]

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَ الْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ

‘‘তিনি (সেই সত্ত্বা) যিনি উম্মিদের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাসুল হিসেবে পাঠােলেন, (যিনি) তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে শোনান, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে আল-কিতাব ও আল-হিকমাহ শিক্ষা দেন (হে নবী মুহাম্মাদ!) আল্লাহ তোমার কাছে নাজিল করেছেন আল-কিতাব (কুরআন) এবং হিকমাহ্ (সুন্নাহ)’। আর ইতিপূর্বে অবশ্যই তারা ছিল পরিষ্কার পথভ্রষ্ঠয় লিপ্ত। [সূরা আল-জুমআ ২]

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَ الْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ –

‘বস্তুতঃ আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছিলেন, যখন তিনি তাদের মাঝে তাদেরই মধ্য থেকে (একজনকে) রাসুল (হিসেবে) পাঠালেন, যিনি তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করে শোনান ও তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন তাদেরকে আল-কিতাব (কুরআন) ও হিকমাহ্ (সুন্নাহ)। আর ইতিপূর্বে অবশ্যই তারা ছিল পরিষ্কার পথভ্রষ্ঠয় লিপ্ত। [সূরা আল-ইমরান ১৬৪]

উপরোক্ত আয়াতগুলোতে দু’টি শব্দ এসছে- الْكِتَابَ (আল-কিতাব) এবং الْحِكْمَةُ (আল-হিকমাহ)।

الْكِتَابَ (আল-কিতাব)– বলতে ‘আল-কুরআন’ উদ্দেশ্য -এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

الْحِكْمَةُ (আল-হিকমাহ) অর্থ- নবী মুহাম্মাদ সা.-এর সুন্নাহ (বানী ও কর্মসমষ্টি), যা আল্লাহ তাআলা হযরত জিবরীল আ.-এর মাধ্যমে মুহাম্মাদ ﷺ-এর উপর শরীয়ত হিসেবে কুরআনের পাশাপাশি অতিরক্তি নাজিল করেছেন, যার দ্বারা মুমিন ব্যাক্তি দ্বীনের সহীহ পরিচয় লাভ করে এবং কুরআন তার কাছে কি চায় কিভাবে চায় -তা উপলব্ধি করতে পারে, হক্ব ও বাতিল চিনতে পারে, হেদায়েতের উপর চলতে পারে।। [বিস্তারিত জানতে দেখুন: তাফসীরে তাবারী, আছার ৮১৭৭ ; তাফসীরে কাবীর, ইমাম রাজি- ৭/৭৩; তাফসীরে ইবনে কাসির; আল-মাওয়াফিকাত, শাতেবী- ৪/১৪; মাজমুঊল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়্যাহ- ১৯/৪৬; তাফসিরুস সাহীহ- ১/৩৪৮; ]

এখন যেহেতু মুসলমানদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে -চাই তা ব্যাক্তি-জীবন, পারিবারিক-জীবন, সমাজ জীবন বা রাষ্ট্রীয় জীবনই হোক না কেনো – ইসলামী শরীয়ত মানা ফরয এবং ইসলামী শরীয়ত বিরোধী অন্য যে কোনো শরীয়ত বা বিধিবিধান মানা হারাম, তাই তাদেরকে এসবের যে কোনো ক্ষেত্রে-তো কুরআন ও সুন্নাহ‘য় বিদ্যমান শরয়ী বিধিবিধানগুলো মেনে চলতে হবে; তার বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। কিন্তু যেসকল বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ’য় পরিষ্কার করে জবাব দেয়া নেই, অথবা জবাব বিদ্যমান রয়েছে কিন্তু তার একাধিক অর্থ ও মর্মের সম্ভাবনা রয়েছে সে সকল ক্ষেত্রে খোদ্ কুরআন ও সুন্নাহ ‘তেই আরো দুটি শরয়ী মানদন্ডের কথা বলা হয়েছে, যার একটি হল ‘কিয়াস’ এবং অপরটি হল ইজমা। তবে এই দুইটি শরয়ী মানদন্ড তখনই গ্রহনযোগ্য বলে অবিহিত করা হয়েছে, যখন তার মূল ভিত্তি হবে কুরআন ও সুন্নাহ অথবা তাতে বিদ্যমান উসূল ও ইশারা-ইংগীতের আলোকে।

এই হিসেবে ইসলামী শরীয়তের মানদন্ড হল ৪টি-

(১) কুরআন
(২) সুন্নাহ (নবী মুহাম্মাদ সা.-এর বাণী ও কর্মসমষ্টি)

(৩) ইজমা (আহলে হক্ব আলেমগণের ঐকমত)- ইজমা ( إِجمَاع )ইসলামী শরীয়তের (আইনের) তৃতীয় উৎস ও মানদন্ড। إِجمَاع শব্দটি جَمع শব্দমূল থেকে উৎপন্ন, যার আভিধানিক অর্থ মিশ্রন, কিছুর মিশ্রিত বা একত্রিত বা সংগৃহিত রূপ, সমাবেশ, ঐক্যমত, দৃঢ সিদ্ধান্ত বা সংকল্প ইত্যাদি। আর ইসলামী পরিভাষায় ইজমা ( إِجمَاع ) বলা হয়- রাসুলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে করোমের জামানা থেকে শুরু করে যেকোনো জামানায় কুরআন-সুন্নাহ’র ভিত্তিতে আহলে হক্ব মুস্তাহিদ আলেমগণের সকলে যে কোনো শরয়ী বিষয়ে ঐক্যমতে উপনীত হওয়াকে। কয়েকটি পয়েন্ট মাথায় রাখলে ইজমা কী -তা বোঝা অনেকটা সহজ হয়ে যাবে।

(১) অবশ্যই ইজমা’র ভিত্তি হতে হবে কুরআন ও সুন্নাহ। কুরআন ও সুন্নাহ’র সাথে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয়ে ইজমা/ঐক্যমত বলে শরীয়তে কিছু নেই।

(২) শুধুমাত্র মুসলমি উম্মাহ’র মধ্যেই ইজমা সংঘটিত হতে হবে। কোনো অমুসলীম কাফের মুরতাদরা সকলে মিলে শরীয়তের কোনো বিষয়ে ঐক্যমতে উপনীত হলেও তার সামান্য কোনো মূল্য ইসলামী শরীয়তে নেই।

(৩) রাসুলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সংঘটিত ইজমা থেকেই ইজমা ধর্তব্য। খোদ্ রাসুলুল্লাহ সা.-এর জামানায় ইজমা’র প্রশ্ন এজন্য আসে না যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর সর্বশেষ রাসুল মুহাম্মাদ সা.-এর উপর শরীয়ত (আইন) হিসেবে যা কিছু নাজিল করেছেন তা-তো কোনো প্রশ্ন ছাড়াই স্বীকার করা সকল মুমিন-মুসলমানদের উপর ফরয, যার অস্বীকার বা প্রত্যাক্ষান যে কাউকে কাফের বানিয়ে দেয়। যেখানে খোদ্ কুরআনই নাজিল হচ্ছে এবং রাসুলুল্লাহ সা. স্বশরীরে উপস্থিত থেকে কুরআন ও হিকমাহ শিক্ষা দিচ্ছেন সেখানে পৃথক ইজমার জরুরতই বাকি থাকে না। সুতরাং বোঝা গেল, ইজমা হল রাসুলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরামের জামানা থেকে ধর্তব্য।

(৪) কোনো বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ’য় পারদর্শি আহলে হক্ব মুসতাহীদ আলেমগণের শরয়ী ঐক্যমতই হল ইজমা। সুতরাং, কোনো বিষয়ে ইজমা কায়েম হওয়ার ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে মুর্খ-জাহেল সর্বসাধারণ মুসলমান কিংবা অপর্যাপ্ত ও অদক্ষ ইলমধারী আলেমদের মতের কোনোই মূল্য নেই, তাদের দ্বিমত পোষনে শরীয়তের কিছুই যায় আসে না। সুতরাং, কোনো বিষয়ে আহলে হক্ব মুসতাহীদ আলেমগণের ইজমাে/ঐক্যমত কায়েম হলে যদি গোটা বিশ্বের সকল মুর্খ-জাহেল মুসলমানরা কিংবা অদক্ষ ইলমধারীরাও ইজমার বিরোধীতা করে, তবুও আহলে হক্ব আলেমদের ইজমা স্বস্থানে স্বশক্তিতে দন্ডায়মান থাকবে, জাহেলদের দ্বিমত বা প্রতিবাদের তুফনে ইমজার কোনোই ক্ষতি হবে না। আহলে হক্ব মুসতাহীদ আলেমগণের শরয়ী ঐক্যমতকেই গোটা মুসলীম উম্মাহ’র ইজমা বলে ধরে নেয়া হয়।

(৪) কিয়াস (শরয়ী ইজতেহাদী অনুমান)- কিয়াস (القياس)-এর আভিধানিক অর্থ হল কোনো নমুনা সামনে রেখে অপর কোনো জিনিস ওই নমুনার সাথে সামঞ্জস্যতা রাখে কিনা তা নির্ণয় করা। আর শরীয়তের পরিভাষায় কিয়াস বলা হয় নতুন উদ্ভুত কোনো বিষয়/মাসআলাহকে ইসলামী শরীয়তের মূল ভিত্তি/উৎস কুরআন ও সুন্নাহ’য় বর্ণিত বিধানবিধিন বা উসূলের আলোকে নিরিক্ষন করে দেখা যে তা কুরআন বা সুন্নাহ’র কোনো বিধান বা উসূলের সাথে সামঞ্জস্যতা রাখে এবং সে অনুযায়ী ওই উদ্ভুত বিষয়ের শরয়ী হুকুম কী হবে তা স্থির করা।

শরয়ী কিয়াস’কে অনেকে খোদ্ ইসতিহাদ (اجتهاد) বলেও অবিহিত করে থাকেন। অবশ্য কথাটি একটি উল্লেখযোগ্য পর্যায় পর্যন্ত সম্পূর্ণ সঠিক। কারণ, ইসতিহাদ কথাটির আভিধানিক অর্থ হল: কোনো কিছু হাসিল করার উদ্দেশ্যে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালানো। শরীয়তের পরিভাষায় ইজতিহাদ বলা হয় ইসলামী শরীয়তের মূল ভিত্তি/উৎস কুরআন ও সুন্নাহ’য় বর্ণিত বিধানবিধিন বা উসূলের আলোকে যে কোনো বিষয়ে শরীয়তের হুকুম কী – তা নির্ণয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো।

বলা বাহুল্য, যে ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহ’য় সুস্পস্ট বিধান বিদ্যমান রয়েছে, সেখানে কিয়াস বা ইসতিহাদ -কোনটারই প্রয়োজন নেই; জায়েযও নেই।

তাই সময়ের সাথে সাথে যেকোন ধরনের পরিস্থিতিতে ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী জীবন যাপন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে একমাত্র বাধা হলো সদিচ্ছার অভাব।

কেএইচ/তারিখ:০৬০৬২৩/১৫:০৬

নিউজ শেয়ারঃ

আরও সংবাদ

জনপ্রিয় সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

আলোচিত সংবাদ

নিউজ শেয়ারঃ
শিরোনামঃ
Verified by MonsterInsights