আইয়ুব আলী
নীলফামারী প্রতিনিধি।।
শ্রেণিকক্ষ সংকটে খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার উত্তর ছাতনাই কেরামতিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে অংশ নেওয়ায় কক্ষে জায়গায় সংকুলান না হওয়ায় খোলা আকাশের নিচেই তাবু টাঙ্গিয়ে ক্লাসসহ দিচ্ছেন পরীক্ষা। শ্রেণিকক্ষ সংকটসহ নানাবিধ সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে ব্যাহত হচ্ছে। তবে, দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চলে আসছে জানালেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, নীলফামারী জেলার সীমান্ত ঘেষা উত্তর ছাতনাই কেরামতিয়া দাখিল মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৫ সালে। এরপর ১৯৮১ সালে এমপিওভুক্ত হলে বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। বর্তমানে ৭শ’র অধিক ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এতো বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস পরিচালনা করা হয় মাত্র ৬টি কক্ষে। পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় হিমশিম খেতে হচ্ছে শিক্ষকদের। ১৯৯৭ সালে সরকারিভাবে নির্মাণ করে দেওয়া হয় একটি ভবন। সেটিরও নাজুক অবস্থা।
এলাকাবাসীরা জানান, আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকার হাজারো মানুষের ভরসা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার গুনগতমান ভালো হওয়ায় দূর দুরন্ত থেকে পাঠদান করতে আসেন অনেক শিক্ষার্থী।
শিক্ষকরা জানান, বর্তমানে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৭শ’ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে পাঠদানে অংশ নিয়েছে। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের মাঠে তাবু টাঙ্গিয়ে একটি ব্রেঞ্চে ৬-৭ জনকে বসিয়ে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের মনযোগে ঘাটতিসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়।
উত্তর ছাতনাই কেরামতিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ৭শ’ অধিক শিক্ষার্থী আমাদের এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। শ্রেণিকক্ষ সংকট থাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাস নিতে হয় স্কুল মাঠে তাবুর নিচে। এর পাশ দিয়ে চলাচল করে বিভিন্ন যানবাহন। ফলে শিক্ষার্থীরা মনযোগ বসাতে পাড়েনা পড়াশোনায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আবাসন। এটার কারণে শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
সহকারী শিক্ষিকা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটি সিসিটিভি ক্যামেরাদ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়। যাতে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
তিনি বলেন, এখানে লেখাপড়া মানও অনেক ভালো হওয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলের ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশোনা করতে আসেন। আমরা তাদের সকল সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকি। কিন্তু এতো কিছুর মাঝে আমাদের বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে একটি ভবন। ভবনটি হলে আমাদের সকল সমস্যা দূর হয়ে যাবে।
মধ্য ছাতনাই গ্রামের অভিভাবক সাহেদ আলী ও ঠাকুরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদপাড়া গ্রামের ফরিদুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়টির সুনাম অনেক শুনেছি। এখানে লেখাপড়ার মানও অনেক ভালো। তাই আমরা আমাদের ছেলে-মেয়েকে এখানে লেখাপড়া করাচ্ছি। এখানে ডিজিটাল মাধ্যমে ক্লাস নেওয়া হয়। পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করা হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে বড় সমস্যা হচ্ছে ভবন নেই। ভবনের কারণে আমাদের ছেলে-মেয়েরা কক্ষের পরিবর্তে মাঠে ক্লাস করছে। এর পরেও আমাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছি।
পশ্চিম ছাতনাই গ্রামের বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মরিয়ম মস্তারী জেরিন বলেন, আমরা একটি ব্রেঞ্চে ছয়জন করে বসি। এরফলে আমরা খাতায় লেখা লেখতে পারিনা। লেখা খারাপ হয়ে যায়। আমাদের খুবেই সমস্যা হয়। আমাদের একটি স্বাভাবিক শ্রেণিকক্ষ প্রয়োজন।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছাঃ রেজওয়ানা আক্তার মনি, মোছাঃ উম্মে মরিয়ম ও মোছাঃ আসমা আক্তার মিম বলেন, আমাদের মাঠে ক্লাস করতে হয়। তপ্ত রোদে আবার কখনো গাছের ছায়ায় গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। শ্রেণিকক্ষের বাহিরে পাঠদানে আমাদের মনযোগে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
সুন্দরখাতা গ্রামের বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নওশাদ আলী বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে ক্লাশরুম সংকটের কারণে আমরা মাঠে বসে ক্লাস করছি। প্রচন্ড রোদের মধ্যে আমাদের ক্লাস করতে হয়। আজকে আমরা এই রোদের মধ্যে পরীক্ষা দিতে এসেছি। ক্লাস রুমে জায়গায় সংকটের কারণে একটি ব্রেঞ্চে ৬-৭ জন করে বসতে হয়েছে। আমরা একটা নতুন ভবন চাই।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ ও প্রাচীর নেই। খেলার মাঠ এবং সীমানা প্রাচীর না থাকার কারণে এখানে সবাই প্রবেশ করেন।
মাঠের পাঠদানে অংশ নিতে বেশিরভাগ সময় দৃষ্টি অন্যদিকে চলে যায়। সঙ্গে মাঠে বসে ঠিকমতো আমরা লিখতেও পারি না। অনেকটা অমানবিক পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। আমাদের নতুন ভবন হলে সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফিয়া তাজনিন বলেন, প্রচন্ড রোদের মধ্যে আমাদের প্রতিদিন ক্লাস করতে হয়। এতে ধুলাবালি আমাদের নাখে মুখে প্রবেশ করে। ফলে আমাদের নানা অসুখ -বিসুখ দেখা দেয়। এর কারণে আমরা অনেক সময় স্কুলে যেতে পারিনা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের এখানে ভালো বাথরুম নেই।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম মেহেদী বলেন, আমাদের এই বিদ্যালয়ে প্রজেক্টরের মাধ্যমে ক্লাস করানো হয়। সবার নিরাপত্তার জন্য রয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। কিন্তু স্যারেরা এতো কিছু করার পরেও আমাদের ভালো একটা ভবন নেই। যে ভবনটি রয়েছে সেটিরও খুব খারাপ অবস্থা।
উত্তর ছাতনাই কেরামতিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মোঃ মামুনুর রশিদ বলেন, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি জেলার শেষ সীমান্তে হওয়ায় এখানে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা প্রায় ৭শ’র অধিক। ছাত্র -ছাত্রীদের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে সংকট দেখা দিয়েছে ক্লাসরুমের। অর্ধেক শিক্ষার্থীকে ক্লাসরুমে রাখলেও বাকিদের মাঠে বাধ্য হয়ে ক্লাস করাতে হচ্ছে তাবু টাঙ্গিয়ে। সেখানে শিক্ষার্থীরা অনেক কষ্টে মধ্যে পড়াশোনা করছেন।
তিনি বলেন, এই উপজেলার মধ্যে বিদ্যালয়টি অনেক সুনাম কুড়িয়েছে। এখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার বিষয়ে সচেতন শিক্ষকরা। পাশাপাশি বৃক্ষরোপনের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তৈরির বিষয়ে নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে বিদ্যালয়টি পুরোপুরি ডিজিটাইলাইজেশন করা হয়েছে। এতো কিছুর পরও প্রধান প্রতিবন্ধকতা শ্রেণিকক্ষ সংকট। তাই আমাদের দাবী একটি একাডেমিক ভবন হলে কেটে যাবে সকল সমস্যা।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ হাজেরুল ইসলাম জানান, আমরা আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম যে, ডিমলা উপজেলার উত্তর ছাতনাই কেরামতি দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক। আমরা ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে যাবো, যদি মেরামতের প্রয়োজন হয় মেরামত করা হবে। তা নাহলে নতুন ভবনের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হবে।





















