।।বিশেষ প্রতিবেদক।।
দেশের শ্রম আদালতে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে আরো ১৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। যেদিন নতুন করে েইসব মামলা দায়ের হয়, সেদিনই অধ্যাপক ইউনুসের বিরুদ্ধে চলমান মামলা স্থগিত করার আহ্বান জানিয়ে বিশ্বের ১৬০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি যেদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি দেয়ার খবর প্রকাশিত হয়। ২৮শে আগস্ট প্রকাশিত চিঠিতে বলা হয়েছে, অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলাগুলোর বিষয়ে তারা শঙ্কিত এবং এর মাধ্যমে তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে বলে তারা মনে করেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, অধ্যাপক ইউনূস ‘ধারাবাহিক বিচারিক হয়রানির শিকার হয়েছেন’।
খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন বিশ্বে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্বস্থানীয় দেড় শতাধিক ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে শতাধিক নোবেল বিজয়ী রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে লেখা খোলা চিঠিতে এই উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন তারা। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোভিত্তিক জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান সিজিয়ন পিআর নিউজওয়্যার তাদের ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ করেছে। চিঠিতে স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে বারাক ওবামা, শিরিন এবাদি, আলগোর, তাওয়াক্কুল কারমান, নাদিয়া মুরাদের মতো শান্তিতে নোবেল বিজয়ীরা রয়েছেন। এছাড়াও রয়েছেন সাহিত্য, অর্থনীতি, পদার্থ, রসায়ন ও চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেলজয়ীরা। এ ছাড়া জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন, যুক্তরাজ্যের ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ধনকুবের স্যার রিচার্ড ব্রানসনসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি রয়েছেন চিঠিদাতাদের তালিকায়।
চিঠিতে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলায় নিজেদের উদ্বেগের কথা বলেছেন ওই বিশিষ্টজনেরা। ‘আমরা এ কারণে শঙ্কিত যে সম্প্রতি তাঁকে নিশানা করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি ধারাবাহিক বিচারিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে আমরা মনে করি। তাঁর নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ৪০ জন বিশ্বনেতা আপনার কাছে যে চিঠি লিখেছিলেন, তার ওপর ভিত্তি করেই এই চিঠি লেখা হয়েছে। আমরা সম্মানের সঙ্গে আপনার প্রতি অবিলম্বে অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক কার্যক্রম স্থগিতের আহ্বান জানাচ্ছি।’ বলা হয়েছে চিঠিতে।
নতুন মামলা : শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে সোমবার অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে ১৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে এসব মামলা দায়ের করেছেন গ্রামীণ টেলিকমের ১৮ জন কর্মচারী, যারা ২০০৬ সালের আগে নিয়োগ পেয়েছিলেন। আইনজীবীরা বলছেন, ১৮ ব্যক্তি আলাদা মামলা দায়ের করলেও সেগুলোর ধরণ একই রকম। যেখানে বলা হয়েছে – শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে যখন মামলা চলছে তখন এ সংক্রান্ত আরো ১৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। মামলার বাদী ১৮ জন শ্রমিকের মধ্যে ১৭ জন অবসরে গেছেন এবং একজন কর্মরত আছেন। বাদীপক্ষের ১৮ জনের আইনজীবী হেলাল উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই মামলায় শ্রমিকরা প্রায় ২২ কোটি টাকা দাবি করছেন গ্রামীণ টেলিকমের কাছে। তিনি বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী কোম্পানির লভ্যাংশের পাঁচ শতাংশ টাকা শ্রমিকদের পাওয়ার কথা। কিন্তু সেটি তারা পায়নি বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
“২০০৬ সাল থেকে হিসেব করে বাৎসরিক মুনাফার পাঁচ শতাংশ টাকা ১৮ জনের জন্য প্রায় ২২ কোটি টাকা হয়। সে টাকা তারা দাবি করেছেন,” বলেন হেলাল উদ্দিন। এই মামলার বাদী শ্রমিকের মধ্যে অনেকই অবসরে গেছেন চার-পাঁচ বছর আগে। তাহলে এতদিন পরে তারা কেন এই মামলা করেছে? এমন প্রশ্নে বাদীপক্ষের আইনজীবী হেলাল উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ সেই ব্যাখ্যা আমার কাছে নাই।”
আরো যত মামলা: অধ্যাপক ইউনূসের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল-মামুন বিবিসি বাংলাকে বলেন, বর্তমানে অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের দায়ের করা একটি মামলা রয়েছে এবং সেটির শুনানি চলছে। এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এছাড়া অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা একটি মামলা রয়েছে বলে জানান আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন। এসব মামলাকে ‘হয়রানিমূলক’ হিসেবে বর্ণনা করছেন অধ্যাপক ইউনূসের আইনজীবী। দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মানি লন্ডারিং-এর অভিযোগে এই মামলাটি চলতি বছরের মে মাসে দায়ের করা হয় এবং এখনো কোন চার্জশিট দেয়া হয়নি। অধ্যাপক ইউনূসকে নিয়ে নোবেল বিজয়ীরা যে বিবৃতি দিয়েছেন সেটি দেশের বিচার বিভাগের উপর ‘হস্তক্ষেপ’ বলে মনে করেন মি. খান। এছাড়াও শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীরা (বর্তমান ও সাবেক) আলাদা-আলাদাভাবে মামলা দায়ের করেছেন অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ: ২৮শে আগস্ট পৃথিবীর ১৬০ জন সুপরিচিত ব্যক্তি ও নেতা অধ্যাপক ইউনূসের পক্ষে যে খোলা চিঠি লিখেছেন, তাতে অধ্যাপক ইউনূসের কারাদণ্ড হতে পারে বলে আশংকা ব্যক্ত করা হয়েছে। এর আগে গত মে মাসে বিশ্বের ৪০জন রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একই ধরণের খোলা চিঠি দিয়েছিলেন।





















