।।নেত্রকোনা প্রতিনিধি।।
নেত্রকোণা-৫ (পূর্বধলা) আসনের তিনবারের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য (এমপি) ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল (বীরপ্রতীক)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। এ অবস্থায় তাঁকে অপহরণ করে ঢাকায় নিয়ে একটি বাসায় আটকে রেখে তাঁর স্বাক্ষর জাল করে ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় গত বুধবার (২৩ আগস্ট) এমপি বেলালের সহধর্মিনী রওশন হোসেন বাদী হয়ে কলেজপড়ুয়া এক ছাত্রী ও স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতাসহ ৯ জনকে আসামী করে পূর্বধলা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।
মামলার আসামীরা হলেন, নাদিয়া আক্তার (২৬), তার ছোট ভাই পূর্বধলা সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তাইফ (২০), উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সোলায়মান হোসেন, সংসদ সদস্যের সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী ফেরদৌস আলম (৪২), কামরুজ্জামান উজ্জ্বল (৪২), কলেজ শিক্ষক নাদেরুজ্জামান স্বপন (৪২), রতন পাল (৩২), ছাত্রলীগকর্মী শাহ আলীম (৩২) এবং সংসদ সদস্যের গাড়িচালক শফিকুল ইসলাম (৪৫)।
এদিকে মামলা দায়েরের পর বিষয়টি এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এ নিয়ে এখন শুধু পূর্বধলা উপজেলাতেই নয়, নেত্রকোণা জেলা জুড়েই চলছে নানারকম আলোচনা-সমালোচনা।
রবিবার (২৭ আগস্ট) সকালে বিষয়টি নিয়ে কথা হলে পূর্বধলা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ওসি বলেন, সংসদ সদস্যকে অপহরণ, তাঁর স্বাক্ষর জাল করে প্রতারণা ও মানহানির অভিযোগে থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি আসামীরা সংসদ সদস্যকে ভুল তথ্য দিয়ে গ্রামের বাড়ি উপজেলার কাজলা গ্রাম থেকে গাড়িতে করে ঢাকায় নিয়ে যান এবং ধানমণ্ডি এলাকায় একটি বাসায় তাঁকে আটকে রাখেন। পরে সংসদ সদস্য বিদেশ চলে গেছেন বলে তার স্ত্রীকে (মামলার বাদী) জানান গাড়িচালক। আসামিরা এক সময় সংসদ সদস্যের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তারা সংসদ সদস্যের বিভিন্ন কাজকর্ম দেখাশোনা ছাড়াও মৌখিক নির্দেশে বিভিন্ন অফিস আদালতে সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করতেন। এ সুযোগে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আসামিরা সংসদ সদস্যকে ঢাকায় আটকে রেখে তাঁর নাম ভাঙিয়েে এবং তার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের কথা বলে লোকজনের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন।
মামলার বাদী এমপি বেলালের স্ত্রী রওশন হোসেন এজাহারে আরও উল্লেখ করেছেন যে, আসামিরা তার স্বামীকে জিম্মি করার পর তার স্বাক্ষর জাল করে প্রধান আসামী নাদিয়া আক্তারের সাথে সংসদ সদস্যের বিয়ের একটি ভুয়া কাবিননামা তৈরি করেন। এছাড়া এমপির স্বাক্ষর জাল করে একটি ভুয়া তালাকনামা বানিয়ে রওশন হোসেনের কাছে পাঠানো হয়। তারা এমপির পরিবারটিকে হেয় করার উদ্দেশ্যে এসব ভুয়া কাগজপত্র ফটোকপি করে ডাকযোগে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরেও পাঠান। পরে গত ২৭ মার্চ বিকেলে পরিবারের লোকজন খোঁজাখুঁজি একপযায়ে ঢাকার একটি বাসা থেকে সংসদ সদস্যকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করেন। উদ্ধারের পরদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য এমপিকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যান পরিবারের লোকজন। সেখানে এমপির মেয়ের বাসায় রেখে চিকিৎসা শেষে গত ১১ আগস্ট তাকে দেশে নিয়ে আসা হয়।
এ বিষয়ে কথা হলে মামলার প্রধান আসামি নাদিয়া আক্তার বলেন, অনেকেই ফোন দিয়ে বিষয়টা আমার কাছে জানতে চাচ্ছেন। এসব ঘটনা শুনলে খুব খারাপ লাগে। বিষয়টি খুবই লজ্জার। বিয়ে সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার সাথে যদি বিয়ে হয়ে থাকে তাহলে আমি আমার স্বামীকে কেন আটকিয়ে রাখব? আর কেনই বা স্বাক্ষর জাল করতে যাব? আমি এখন এসব বিষয় নিয়ে বিব্রত। সংসদ সদস্যের সাথে আমাদের পরিবারের সখ্যতা আছে- এটা ঠিক। আমার ভাইকে তিনি নেতা বানিয়েছেন। আসা-যাওয়াও হতো, কিন্তু অন্য কোনো বিষয় নেই, যা কিনা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ভিত্তিহীন।
অপর আসামী ফেরদৌস আলম বলেন, আমাদের নামে করা মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। বাদী মামলার এজাহারে উল্লেখ করেছেন, ২৭ মার্চ সংসদ সদস্যকে তারা উদ্ধার করেন। অথচ এর আগের দিন ২৬ মার্চ সকালে পূর্বধলা উপজেলা সদরের অডিটরিয়ামে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ওসি, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া কথিত অপহরণ ও উদ্ধারের সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্য ১৩ মার্চ সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন, ২৩ মার্চ উপজেলার শ্যামগঞ্জ বাজারে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনসহ এলাকার অন্তত ৮টি সভা ও অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। যার তথ্য-প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে।
এদিকে এমপি ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল দীর্ঘ ২০ বছর ধরে পূর্বধলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি টানা তিনবারের সংসদ সদস্য। এমপির মুঠোফোনে বার বার যোগাযোগ করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। তিনি অসুস্থ থাকায় কারও সাথে তেমন একটা কথা বলেন না এবং স্মৃতিশক্তিও অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।






















