আজ ২৪শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ ও ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ এবং ১৬ই জিলকদ, ১৪৪৫ হিজরি

ডেঙ্গু রোগীতে ভরে গেছে নগরের হাসপাতাল, নগরপিতা ব্যক্তিগত ভ্রমণে ইউরোপে

  • In শীর্ষ
  • পোস্ট টাইমঃ ১৭ জুলাই ২০২৩ @ ১০:২৪ অপরাহ্ণ ও লাস্ট আপডেটঃ ১৭ জুলাই ২০২৩@১০:২৪ অপরাহ্ণ
ডেঙ্গু রোগীতে ভরে গেছে নগরের হাসপাতাল, নগরপিতা ব্যক্তিগত ভ্রমণে ইউরোপে
ছবি- ফাইল ছবি

।।বিশেষ প্রতিবেদক।।

রাজধানীতে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিশেষজ্ঞরা যাকে জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন। তবে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ মনে করছে, এখনও সেই পরিস্থিতি আসেনি। যদিও গত দুই মাস ধরেই বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর মধ্যেই হাসপাতালগুলোয় ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২০ হাজার আর মৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। দেশের ৬৩টি জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ঢাকাতেই গত ১৬ দিনে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৪২ জন। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ১৩ হাজার। ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়েছে। দক্ষিণ সিটির আওতাধীন পূর্ব জুরাইন এলাকার বাসিন্দারা মশকনিধন কার্যক্রমে গাফিলতির অভিযোগ এনে সমাবেশ পর্যন্ত করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকার দুই মেয়রের আরও কার্যকর ভূমিকা চায় বিভিন্ন সংগঠন। মশকনিধন কার্যক্রমে সামনে থেকে তাঁদের নেতৃত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও। কিন্তু ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির মধ্যেই ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ১৭ দিনের জন্য গত বৃহস্পতিবার সপরিবার বিদেশ সফরে গেছেন। এ নিয়ে কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

এই বছর বাংলাদেশে মোট আক্রান্ত হয়েছে ২০ হাজার ৮৭৮ জন আর মৃত্যু হয়েছে ১০৬ জনের। এমন প্রেক্ষাপটে রোববার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। রোববার ঢাকার মুগদা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক একটি সেমিনার হয়। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন ঐ সেমিনারে বলেছেন, “ডেঙ্গুর চারটি ধরনেই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এখন দেশে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি চলছে, যা জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়েছে উঠেছে।‘’ তিনি বলেন, এক সময় ডেঙ্গু রোগটি মৌসুমি রোগ বলে মনে করা হলেও গত দুই বছর ধরে সেখানে ভিন্ন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে গত বছর এবং এই বছরের মধ্যে ডেঙ্গুর বিস্তারে আসলে কোন বিরতি ছিল না। বিশেষ করে শহর এলাকায় এই অবস্থার সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়েছে। তিনি মনে করেন, এখনি এটিকে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে কোভিড মোকাবিলার মতো করে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বামী আজিম মিয়াকে নিয়ে ভর্তি রয়েছেন মনোয়ারা বেগম। তিনি বলছেন, ‘’খাটের ওপরে, নীচে, ডাইনে-বামে সবদিকে ডেঙ্গু রোগী। তিনদিন হইলো স্বামীরে এখানে ভর্তি করছি। ডাক্তার স্যালাইন আর ওষুধ দিছে, জ্বর একটু কমছে।‘’ তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগ মনে করছে, ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটলেও এখনো দেশে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করার মতো সময় আসেনি। তবে সেই বিষয়েও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

রোববার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশর স্বাস্থ্য বিভাগ। সেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি ঘোষণার সময় এখনো আসেনি। যখন করোনা ছিল, তখন এটা করা হয়েছিল। এ ধরণের কিছু করতে হলে পলিসি লেভেলে আলোচনা করতে হবে। আমরা আমাদের উদ্বেগের বিষয়টি তাদের জানিয়েছিল। প্রয়োজনে আবারো তাদের জানাবো।

বাংলাদেশে ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর ‘পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করেছিল সরকার। সেই ঘোষণার আলোকে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে এবারের বাস্তবতায় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, পাবলিক হেলথ পরিস্থিতি ঘোষণার মতো অবস্থা এখনো তো হয়নি। তবে ডেঙ্গুর এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে ইমার্জেন্সি জারির মতো কিনা, আমরা সেটা পর্যালোচনা করছি।

মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, আমরা দেখছি আশঙ্কাজনকভাবে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি। তবে রোগী সংখ্যা আরও বাড়তে থাকলে নিশ্চয়ই আমরা সংকটে পড়ে যাবো, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের কোন সংকট নেই। আমার সবাই মিলে আশা করি ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে পারবো।

শুধুমাত্র ঢাকা মহানগরীতেই সরকারি এবং বেসরকারি মিলিয়ে এখন ৫৩টি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে। সবচেয়ে বেশি রোগী রয়েছে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এসএসএসএমসি ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল, বেসরকারি হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে অনেক রোগী ভর্তি রয়েছে। বড় হাসপাতালগুলোয় জায়গা না হওয়ায় অনেক রোগী মেঝেতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।

এরকম একটি হাসপাতালের চিকিৎসক তৌফিক আহমেদ বলেন, “প্রতিদিনই জ্বর নিয়ে রোগী আসছে। আমরা তো আর কাউকে ফিরিয়ে দিচ্ছি না। অবস্থা ভালো মনে হলে ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু বেশিরভাগ রোগী আসছে কিছুটা খারাপ অবস্থায়।” তিনি জানান, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে খুব অল্প সময়েই অবস্থার অবনতি হতে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি বৃষ্টি হওয়ায় বৃষ্টির পানি জমে জমে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বেড়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।

গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৬২ হাজার ৩৮২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। মৃত্যু হয়েছিল রেকর্ড ২৮১ জনের। সেই বছরেও জুলাই, অগাস্ট মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে যতো ডেঙ্গু রোগী আক্রান্ত বা মৃত্যু হচ্ছে, তার প্রকৃত চিত্র এই পরিসংখ্যানে আসছে না। কারণ অনেকেই যেমন ঘরে বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের তথ্য এখানে যুক্ত হচ্ছে না। আবার দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর তথ্য এখানে নিয়মিত আসছে না। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ডেঙ্গু রোগীদের তথ্য আসে না স্বাস্থ্য বিভাগে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির মধ্যেই ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের বিদেশ ভ্রমণের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ নগরবাসী। মেয়রের এই ভ্রমণ নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৪ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ১৭ দিন পারিবারিক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে যুক্তরাজ্য, স্পেন, ডেনমার্ক ও সেনজেনভুক্ত অন্যান্য দেশ ভ্রমণ করবেন। এই ভ্রমণের বিমান ভাড়া, থাকা-খাওয়া এবং যাবতীয় ব্যয়ভার মেয়র ব্যক্তিগতভাবে বহন করবেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তহবিল থেকে ভ্রমণের ব্যয় বহন করা হবে না।

ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে বিদেশ ভ্রমণের বিষয়ে জানতে মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের মুঠোফোনে (ভাইবারে) দেশের শীর্ষ এক সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে তিনি কোনো জবাব দেননি। পরে সিটি করপোরেশনের মুখপাত্র ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছেরের কাছে একই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনিও এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

মেয়রের বিদেশযাত্রার পরের দিন গত শুক্রবার বিকেলে ‘মশকনিধনে গাফিলতির প্রতিবাদে এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে’ সমাবেশ করেছেন পূর্ব জুরাইন এলাকার বাসিন্দারা। এতে শতাধিক স্থানীয় মানুষ অংশ নেন। সমাবেশে অভিযোগ করা হয়, সিটি করপোরেশনের দায়িত্বহীনতার কারণে ডেঙ্গু মহামারির আকার ধারণ করেছে।

‘আমরা জুরাইনবাসী ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে চাই’ এই ব্যানারে আয়োজিত সমাবেশে বলা হয়, পূর্ব জুরাইনের প্রতিটি ঘরেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী রয়েছেন। রক্ত দিতে দিতে এলাকার তরুণেরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এ এলাকায় অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।

সমাবেশে পূর্ব জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মেয়র ইউরোপে ঘুরতে গেছেন। ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে মেয়রের বিদেশ ভ্রমণের বিষয়ে নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত স্থপতি ইকবাল হাবিব সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘মেয়র পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভ্রমণে যেতেই পারেন। কিন্তু আমরা তো এখন ডেঙ্গু মহামারিতে পড়লাম। এই পরিস্থিতি যদি মেয়র অনুভব না করেন, তাহলে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে প্রাপ্তিটা কম হয়।’ ইকবাল হাবিব বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে মেয়র নিজে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে মশকনিধনে এবং ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে গণ-আন্দোলন গড়ে তুলবেন বলে মানুষের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সংকটকালে তাঁর এই ভ্রমণ দুঃখবোধ জাগিয়ে দেয়।’

নিউজ শেয়ারঃ

আরও সংবাদ

জনপ্রিয় সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

আলোচিত সংবাদ

নিউজ শেয়ারঃ
শিরোনামঃ
Verified by MonsterInsights