আজ ১৮ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ ও ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ এবং ১২ই জিলহজ, ১৪৪৫ হিজরি

বিশ্বজুড়ে কেন এই মন্দাবস্থা

  • In শীর্ষ
  • পোস্ট টাইমঃ ৬ জুন ২০২৩ @ ০৯:২৯ অপরাহ্ণ ও লাস্ট আপডেটঃ ৬ জুন ২০২৩@০৯:৩২ অপরাহ্ণ
বিশ্বজুড়ে কেন এই মন্দাবস্থা

।।বিশেষ প্রতিনিধি।।

এ বছর জানুয়ারিতে দাভোসে বসেছিল ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন। উদ্বোধনী দিনে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি সাহায্য সংস্থা অক্সফাম একটি প্রতিবেদন হাজির করে। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’। এই শিরোনাম আমাদের সামনে এক নির্মম সত্যকে প্রকাশ্যে আনে। সত্যটি হলো, এই পৃথিবীতে কেবল মুষ্টিমেয় কিছু ধনী মানুষের টিকে থাকার বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে দিনকে দিন। বাকী সবার জন্য হাজির হচ্ছে বিলুপ্ত হওয়ার বাস্তবতা। এই বাকী সবাই বলতে কেবল মনুষ্যপ্রজাতি নয় কিন্তু। হিউম্যান-সেন্ট্রিক ইতিহাস-বাস্তবতার বাইরে এসে এই সবাই বলতে আমি পৃথিবীর লক্ষ-কোটি বৈচিত্র্যময় প্রাণের কথা বলছি। এদের সবার ধ্বংস হওয়ার বাস্তবতা তৈরি করছে বিশ^জুড়ে আধিপত্যকারী রাক্ষস পুঁজি। পৃথিবীটাকেই গিলে খেতে বসেছে নব্য রাক্ষসেরা।

অক্সফামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের পর সারা বিশ্বে যত সম্পদ তৈরি হয়েছে, তার দুই-তৃতীয়াংশই গেছে বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর পকেটে। অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ সম্পদ বণ্টিত হয়েছে বিশে^র বাকী ৯৯ শতাংশ মানুষের মধ্যে। এখানেই শেষ নয়। বিগত এক দশকে সৃষ্ট সম্পদের অর্ধেকের মালিক হয়েছেন শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী। একদিকে সম্পদ যখন মুষ্টিমেয় মানুষের কুক্ষিগত হতে থাকে, একই সেই কারণে এর বিপরীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা আর দারিদ্র্যও বাড়তে থাকে। অক্সফামের হিসেবে, বিশ্বে তৈরি হওয়া সম্পদ থেকে সমাজের নিচের দিকের ৯০ শতাংশ মানুষের ১ ডলার আয়ের বিপরীতে বিলিয়নিয়াদের আয় ১৭ লাখ ডলার।
২০২০ সালে করোনা অতিমারিকে ব্যবসার উপাদান বানিয়ে দানবীয় পুঁজির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ফুলেফেঁপে উঠেছিল। আর ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে মুনাফার পাহাড় গড়েছে জ¦ালানি ও তেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো। অক্সফামের হিসেবে গত বছর ৯৫টি খাদ্য ও জ্বালানি কোম্পানি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ মুনাফা করেছে। তাদের সম্মিলিত মুনাফার পরিমাণ ৩০৬ বিলিয়ন বা ৩০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৭০০ কোটি ডলার তারা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করেছে। এখানে যুদ্ধজনিত রক্তপাতকে মুনাফার উপাদান করা হয়েছে, কিংবা বলতে পারেন করা গেছে।

মহামারি আর যুদ্ধ যেমন করে মুষ্টিমেয় মানুষকে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বানাতে পেরেছে, তেমনি করেই বিশ^ব্যাপী হাজির করতে সক্ষম হয়েছে মন্দামুখী পরিস্থিতি। ২০২৩ এ এসে আমরা কি মন্দার মধ্যে রয়েছি? মন্দায় যাচ্ছি? অর্থনীতির অ্যাকাডেমিক আলাপ যাই বলুক না কেন, বিশ^জুড়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে ভয়াবহ সংকট অতিক্রম করছে, তা বুঝতে বাকী নেই কারও। নব্য উদারবাদী বাজারের অপরিহার্য অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আভাস দিয়েছে বাংলাদেশসহ বিশে^র সব দেশের অর্থনীতিতে মন্দা আসন্ন। রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতি, কঠোর নীতি, ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন আর নিরন্তর কোভিড অতিমারি মিলে বিশ^জুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষ বাড়িয়েছে। বাড়িয়েছে স্বল্পোন্নত দেশের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। বিশে^র ৩ বৃহৎ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনও এই মন্দার অভিঘাতে ভুগবে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। আরও খারাপ কিছুরও আভাস দিয়েছে ওই রিপোর্ট। তারা বলছে, গত ২০২১- ২০২২ অর্থবছরে যেখানে ৩.২ শতাংশ বৈশি^ক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, ২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে ২.৭ শতাংশ হতে পারে।

আসলে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য অতিমারি আর যুদ্ধকে দায়ী করা হলেও আমাদের বিদ্যমান পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাই বরং অতিমারি আর যুদ্ধের জন্য দায়ী। প্রথমে আসি করোনাভাইরাসের কথায়। ঠিক কোথায় থেকে ভাইরাসটি চীনের উহানে এসেছিল, তা এখনও সুনিশ্চিত নয়। তবে প্যাঙ্গোলিন নামের এক বন্যপ্রাণীকে এর সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের একাংশ বলছিলেন, চীনের বাজারে চোরাই পথে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা এই প্রাণীটির দেহে এমন একটি ভাইরাস পাওয়া গেছে যা কোভিড নাইনটিনের সাথে ‘ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।’ বিজ্ঞানীদের এই অনুমান যদি সত্যি হয়, তাহলে বলতে হয়, একটি অবৈধ বন্যপ্রাণীর মাংসের বাজার সিন্ডিকেট এই ভাইরাসকে আমাদের পরিসরে মহামারী আকারে হাজির করেছে। প্রাণসংরক্ষণবাদীরা বন্যপ্রাণীর বেচাকেনা বন্ধ করতে বলছেন। তবে বাজার তো থামবে না। কেনা-বেচাই তার টিকে থাকার শর্ত। টেকার স্বার্থেই সে এইসব জীবাণুবাহী প্রাণীর মাংস বিক্রির বৈধ/অবৈধ নেটওয়ার্ক নিরন্তর রাখে। আর বাজার ব্যবস্থার দায় এসে পরে সমগ্র মনুষ্যপ্রজাতির ওপর। জীববিজ্ঞানী রব ওয়ালেস মনে করেন, ভাইরাসগুলোর ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ার কেন্দ্রে রয়েছে খাদ্য উৎপাদন ও বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর মুনাফামুখিতা। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফখণ্ড গলে মাটির নিচ থেকে বহু অজানা ভাইরাস বের হয়ে আসছে বলেও খবর দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যে জলবায়ু পরিবর্তন পুঁজিবাদী মুনাফাবাজিরই ফল, বৈজ্ঞানিকভাবে এটি প্রমাণিত।
ইউক্রেন যুদ্ধ নামে ডাকা হচ্ছে, সেটাও আসলে মুনাফাবাজি আর দখলদারিত্বের দ্বিপাক্ষিক লড়াই। মার্কিন অস্ত্র ব্যবসার প্রসার হয়েছে এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। রুশবিরোধী নিষেধাজ্ঞার কারণেও ইউরোপে তাদের ব্যবসার পরিসর ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। আর অঞ্চলগত কর্তৃত্বের প্রশ্নতো রয়েছেই। সবমিলে লাভ আর লাভ। যুক্তরাষ্ট্র তাই কোনভাবেই চায় না, এই যুদ্ধ বন্ধ হোক। শান্তি আলোচনা থেকে কিয়েভকে বিচ্ছিন্ন রাখার মার্কিন রাজনীতি প্রকাশ্যেও এসেছে বেশ কয়েকবার। ওদিকে রুশ একনায়ক পুতিনের তো পোয়াবারো। তারতো কোনও জবাবদিহিও নেই। নিরঙ্কুশ ক্ষমতাতন্ত্রের ইন্দ্রজালে থাকা পুতিন তাই পরোক্ষে বলেই রেখেছেন, যুদ্ধে যদি ইউক্রেন পশ্চিমা অস্ত্রে জিততে নেয়, তো পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করে ‘অস্তিত্ব রক্ষা’ করবে ক্রেমলিন।

অতিমারিতে প্রাণ গেছে লাখ লাখ মানুষের। কোটি কোটি মানুষ মরছে ক্ষুধা-অপুষ্টিতে। ইউক্রেন যুদ্ধেও মরছে হাজার হাজার বেসামরিক। সেনারা তো দেশপ্রেমের দিনমজুর, তাদের কথা থাক। অথচ এই অতিমারি, যুদ্ধ আর ক্ষুধাকে উপজীব্য করেই সম্পর্দের পাহাড় গড়ছে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি। এইযে কোটি কোটি মানুষকে ক্ষুধার্ত রেখে, যুদ্ধবাজির মারণাস্ত্রে হাজার হাজার মানুষের রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়ে হলেও পুঁজি চায় বেচাবিক্রি, চায় মুনাফা। পুঁজি সবকিছুকেই বিক্রয়যোগ্য পণ্যে রূপান্তর করে। এমনকী আমাদের এই পৃথিবীটাকেও। যুদ্ধাস্ত্রের উন্নয়ন, পশু-পাখির মাংস খেয়ে খেয়ে তাদের প্রজাতিগতভাবে ধ্বংসের বন্দোবস্ত আর বিশ^ব্যাপী জীবাশ্ম জ¦ালানিভিত্তিক মুনাফাবাজির মধ্য দিয়ে তারা পৃথিবীটাকেই ধ্বংসের প্রায় কাছাকাছি নিয়ে গেছে। বিশ^জুড়ে যে মন্দাবস্থা, সেটার নেপথ্যেও আসলে পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ সংকটই মূল কারণ।

বিপ্রি/এএইচপি/তারিখঃ ০৬০৬২৩/২১:৩১

নিউজ শেয়ারঃ

আরও সংবাদ

জনপ্রিয় সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

আলোচিত সংবাদ

নিউজ শেয়ারঃ
শিরোনামঃ
Verified by MonsterInsights