শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি।।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মাঝে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। এর আগে মণ্ডপগুলোতে চলে সিঁদুর খেলা আর আনন্দ-উৎসব। হিন্দু সধবা নারীরা প্রতিমায় সিঁদুর পরিয়ে দেন, নিজেরা একে অন্যকে সিঁদুর পরিয়ে দেন। চলে মিষ্টিমুখ, ছবি তোলা আর ঢাকের তালে তালে নাচ-গান।
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মঙ্গলবার (২৪ অক্টোবর) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি আবার কখনো ভারী বৃষ্টিপাত হয় কক্সবাজারে।
ঘূর্ণিঝড় হামুনের ৭ নম্বর বিপদ সঙ্কেতের মধ্যে বিরূপ আবহাওয়া উপেক্ষা করে প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে সৈকতে সমাগম হয় পর্যটক আর পূজারিদের ঢল।
আয়োজকরা জানান, শুধুমাত্র সৈকতের লাবণী পয়েন্টে এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ১৫১টি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া একই সময়ে কক্সবাজারের রামুর বাঁকখাল নদী, চকরিয়ার মাতামুহুরী, টেকনাফের সাগর ও নাফনদী, উখিয়ার ইনানী সৈকত ও রেজুনদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। রামু ও চকরিয়ায় পৃথক প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠান করা হয়েছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, দশভূজা দেবী মহালয়ার দিন ‘কন্যারূপে’ পৃথিবীতে আসেন। আর দশমার দিন বিসর্জনের মাধ্যমে এক বছরের জন্য বিদায় জানানো হয় তাকে। দেবীর আগমন ও প্রস্থানের মাঝে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত মাঝের পাঁচদিন নানা আয়োজনে চলে দুর্গোৎসব।
সন্ধ্যায় নানা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য আর উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিমা বিসর্জন। এর মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে দুর্গ উৎসবের।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা মঙ্গলবার ছিল প্রতিমা বিসর্জন ও বিজয়া দশমী। সকাল থেকে কক্সবাজার জেলার পূজামণ্ডপগুলোতে বিরহের সুর বেজে ওঠে। মা দেবী দুর্গা ফিরে গেলেন কৈলাসে সন্তানদের আশীর্বাদ করে। সকাল থেকে কক্সবাজার জেলার পূজামণ্ডপগুলোতে ভক্তদের মাকে বিদায় দেয়ার অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে দেখা যায়। বিকেল তিনটার পর থেকে কক্সবাজারের বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে প্রতিমা বহনকারী ট্রাকগুলো কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের দিকে আসতে থাকে। পুরো শহর জুড়ে নেয়া হয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
কক্সবাজার সৈকতের লাবণী পয়েন্টের উন্মুক্ত মঞ্চে চলে প্রতিমা বিসর্জনের অনুষ্ঠান। এরআগে রং ছিটানো আতশবাজি ফুঁটিয়ে ঢাকঢোল বাজিয়ে বের করা হয় শোভাযাত্রা।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক, সংসদ সদস্য কানিছ ফাতেমা আহমেদ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শাহীন ইমরান ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি মো: জিল্লুর রহমান, কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মাহফুজুল ইসলাম, কক্সবাজারের পৌর মেয়র মাহবুবুর রহমান ও কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান প্রমুখ।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উজ্জ্বল করের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ, প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক নেতাসহ নানা সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব। বিসর্জন মঞ্চ থেকে মন্ত্র উচ্চারণ শেষে সমুদ্র সৈকতে শুরু হয় বিসর্জন। এরপর একে একে পূজা মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয় সাগর সৈকতে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উজ্জ্বল কর বলেন, এবার জেলা ও উপজেলা থেকে আসা ১৫১টি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। তবে ঘূর্ণিঝড় হামুনের প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় আমরা অনুষ্ঠান সীমিত করেছি। আমরা মা দুর্গার কাছে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে মানুষ যেন রক্ষা পায় সেই প্রার্থনা করেছি।
এদিকে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানকে ঘিরে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে দুপুর ২টার পর থেকে জেলার উখিয়া, টেকনাফ, সদর, ঈদগাঁও, চৌফলদণ্ডী ছাড়াও নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে শোভাযাত্রা সহকারে প্রতিমা আসতে শুরু করে। প্রতিমায় ভরে যায় অনুষ্ঠানস্থল। বিকেল সাড়ে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সৈকতের বালুচরে রাখা দুর্গা প্রতিমা ঘিরে চলে ভক্তদের শেষ আরাধনা। শুধু তাই নয়, নাচে-গানে এক অন্য রকম আনন্দমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয় বিশ্বের দীর্ঘতম এ সৈকতে। প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানকে ঘিরে সমাগম ঘটে পর্যটকসহ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আসা কয়েক হাজার মানুষের।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম বলেন, প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। সমুদ্রে প্রবেশের মুখে চেকপোস্ট স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থান সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।
সি লাইফ গার্ডের কর্মকর্তা জয়নাল আবদীন ভুট্ট বলেন, প্রতিমা বিসর্জনে যারা সমুদ্র নামবেন তাদের নিরাপত্তায় আমাদের পুরো টিম কাজ করছে। তবে আমাদের জনবল কম হাওয়ায় একটু চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিওনের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান বলেন, প্রতিমা বিসর্জনের দিনে সমুদ্র সৈকতে অনেক মানুষের সমাগম হয়েছে। বিচের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আমাদের ট্যুরিস্ট পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। পাশাপাশি ওয়াচ-টাওয়ার থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হেল্প ডেস্ক রয়েছে। কেউ বিপদে পড়লে আমাদের জানালে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে পারব।
পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উজ্জ্বল কর জানিয়েছেন, জেলায় ৩১৫টি পূজা মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫১টি প্রতিমা পূজা আর ১৬৪টি ঘট পূজা। প্রতিটি পূজো মণ্ডপে ছোট বড় ছয়টি প্রতিমা রয়েছে।






















