আজ ২৬শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ও ১১ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ এবং ১৩ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

গলা কেটেও প্রথম হলেন শালিক!

  • In বিশেষ সংবাদ
  • পোস্ট টাইমঃ ৭ অক্টোবর ২০২৩ @ ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ ও লাস্ট আপডেটঃ ৭ অক্টোবর ২০২৩@১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ
গলা কেটেও প্রথম হলেন শালিক!

শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি।।

বীচ কার্ণিভালে পর্যটকদের কাছ থেকে গলা কাটা দাম নিয়েও রেস্তোরা ক্যাটাগরিতে প্রথম পুরষ্কার পেয়েছে শহরের কলাতলির ডলফিন মোডের শালিক রেস্টুরেন্ট এন্ড বিরানী হাউজ। রুচিসম্মত খাবার পরিবেশন করেছে দাবি করে শালিক রেষ্টুরেন্টকে ওই পুরষ্কার দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শালিককে পুরষ্কৃত করার পর থেকেই এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তীব্র সমালোচনাও করছেন ভোজন রসিক লোকজন সহ স্থানীয়রা।

তাদের মতে, শালিক রেস্টুরেন্টের কারণে সমগ্র কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উল্টো তাদের পুরস্কৃত করে গলা কাটতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, দুর্নাম ঘোচাতে জেলা প্রশাসনের পর্যটন সংশ্লিষ্ট কর্তা বাবুদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে এই পর্যটন মেলার প্রথম পুরস্কারের ক্রেষ্টটি ভাগিয়ে নিয়েছেন শালিক রেস্টুরেন্টের মালিক নাছির উদ্দিন।

খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে আগত তিনজন অতিথিসহ হোটেল আল সাফার, ব্যবস্থাপনা পরিচালক খোরশেদ আলম বীচ কার্নিভালে ঘুরতে যান। সেখানে তাঁরা শালিক রেস্তোরায় নাস্তা করেন। তাঁরা ৪ টি প্লেইন নান, ৪ হাফ কাপ দুধ চা, একটি ছোট বাটির হাফ সাইজের পায়া হালিম ও দুই লিটার পানি পাণ করেন। এর বিপরীতে বিল আসে ৯৮০ টাকা। ১৫% ছাড়ে তাঁরা বিল পরিশোধ করেন ৮৩৩ টাকা। যেখানে প্লেইন নান ৫০ টাকা, চা ৮০ টাকা, পায়া হালিম ৪০০ টাকা ও দুই লিটার পানির দাম ধরা হয় ৬০ টাকা। অথচ ওই কার্নিভালে শালিকের স্টলের চেয়ে অনেক কম দামে এসব খাবার কলাতলীর শালিক রেষ্টুরেন্টে বিকিকিনি হয়।

সেসময় কার্ণিভাল স্টল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা শালিক রেষ্টুরেন্টের ম্যানেজার সাঈদ আহমেদ বলেন, আমাদের কলাতলীর শালিক রেস্তোরায় প্রতি পিচ প্লেইন নান ভ্যাট সহ ৩৫ টাকা, রেগুলার হাফ কাপ চা ভ্যাট সহ ৪০ টাকা, হাফ পায়া হালিম ভ্যাট সহ ৩৫০ টাকা ও ২ লিটার পানি ৪০ টাকা নির্ধারণ করা রয়েছে।

বীচ কার্ণিভালের দাম কেন বেশি জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, কলাতলীর শালিক রেস্তোরা আমাদের রেগুলোর অতিথিদের জন্য। কিন্তু কার্নিভাল তো অস্থায়ী তাই খরচ বেশি। একারণে আমাদের নিয়মিত দামের চেয়ে কার্নিভালে দাম বেশি৷

এর একদিন পরই ৩০ সেপ্টেম্বর কার্ণিভালের স্টলে খাবার খেয়ে অতিরিক্ত দামের বিষয়টি জেলা প্রশাসনের মিড়িয়া সেলে অবহিত করেন কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য সুনীল বড়ুয়া। সেখানে তিনি একটি অরেঞ্জ জুসের দাম ২০০ টাকা রাখা হয়েছে জানিয়ে শালিক রেষ্টুরেন্টের রশিদের ছবিও দেন। তারপরও অভিযোগটি যাচাইও করেননি সংশ্লিষ্ঠরা। উল্টো কার্নিভালের শেষ দিনে রুচ্চি সম্মত খাবার পরিবেশন করেছে দাবী করে শালিক রেস্তোরাকে প্রথম পুরষ্কার দেয় আয়োজকরা। আর এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় চলছে।

শহরের কলেজছাত্র তাওহিদ আরমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পর্যটন মেলায় ঢাকা থেকে এক বন্ধু কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন। রেস্তোরাঁগুলোতে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা পেয়ে তাকে নিয়ে শালিক রেষ্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। খাবারের পর বিল দেখে জানতে পারলাম স্বাভাবিক দামের চেয়ে উল্টো কয়েক গুণ পর্যন্ত দাম নিয়েছেন। শালিক রেস্টুরেন্টের এমন গলাকাটা বাণিজ্যে চরম ক্ষুব্ধ হয়েছি তখন। এখন তাদের হাতে পুরস্কারের ক্রেষ্ট দেখে রীতিমত অবাক হয়েছি।

অভিযোগের পাহাড় রয়েছে শালিকের বিরুদ্ধে। এরপরও শালিক কার্নিভালের প্রথম পুরস্কারের খেতাব পেয়েছেন দেখে শুধু হতাশই নয়, রীতিমত বিস্মিত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সদরের বাংলা বাজারের বাসিন্দা তারিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, শালিক শুধু গলাকাটা বললেই কম হবে, রীতিমতো অবাক হয়েছি একটি মালটার জুসের দাম রাখা হয়েছে সাড়ে ২০০ টাকা। ছাড়ের ঘোষনা থাকলেও দেন নি। অথচ এ মানের অন্য রেস্টুরেন্টে একটি জুসের দাম নেওয়া হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। শুধু জুস নয় এ রেস্টুরেন্টে সবকিছুরই বাড়তি দাম নিয়েছে।

পর্যটক দম্পতি কাউছার চৌধুরী বলেন, রেস্টুরেন্টের নামে শালিক মানুষকে আর্থিকভাবে জুলুম করছে। এটির ব্যাপারে প্রশাসনকে অবশ্যই নজরে নেওয়া দরকার। অন্যথায় এভাবে চলতে থাকলে কক্সবাজারের প্রতি পর্যটকরা বিমুখ হয়ে যাবে। পাশাপাশি শালিকের মতো গুটি কয়েক জুলুমবাজ ব্যবসায়ীর জন্য বিশ্বের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পর্যটন শহর কক্সবাজারের চরম বদনাম হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলাতলীর স্থানীয় এক যুবক বলেন, অতিরিক্ত দাম হাঁকানোর কারনে খেতে আসা পর্যটনসহ স্থানীয়দের সঙ্গে শালিকের লোকজনকে প্রায় সময় বাগবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।

কয়েক দিন আগেও খাবারের দামসহ নানা বিষয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ করে ঢাকার এক পর্যটক। পরে রেস্টুরেন্ট মালিকসহ ম্যানেজাররা ডিসকাউন্ট দিয়ে তাদের বিদায় করার চেষ্টা করেন। এই রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়ে একই সমস্যায় পড়েন ঢাকার ধানমন্ডি থেকে আসা আমার পরিচিত দম্পতি। তারাও খাবার শেষে বিল দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন।

শালিকের প্রথম পুরষ্কার পাওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হলে সেখানে বাবুল দাশ নামের একজন লিখেন গত রবিবার (১ অক্টোবর) ৪ বন্ধুকে নিয়ে কার্ণিভালের শালিক রেষ্টুরেন্টে ডুকেছিলাম খাবারের দাম এত বেশি যে নানা অজুহাতে পরে বেরিয়ে পড়েছি।

খাইরুল হাসান অন্য আরেক ফেসবুক ব্যবহারী লিখেন ‘বদনাম গুলোকে নামে পরিবর্তণ করার সুযোগ করে দিয়েছে’।
রুমি আকন্দ নামে আরেকজন লিখেছেন— ডাকাতিতে শালিককে পুরষ্কৃত করা হবে কবে?’
ফাহিম আবিদ নামের একজন লিখেছে— মূল্যটা যদি স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুন তাহলে অবশ্যই রুচিসম্মত খাবার পরিবেশন করা যায় সেটা আমরা জানি।

তবে মেলার দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট (এডিএম) মো. ইয়ামিন হোসেন বলেন, শালিক কেন প্রথম হয়েছে আমার জানা নেই৷ যাচাই বাছাই করে পুরষ্কৃত করার জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট (রাজস্ব)’র অধীনে একটি কমিটি করা হয়েছিল। সেই কমিটির সুপারিশ মতেই শালিক রেস্তোরা প্রথম করা হয়।

এবিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট (রাজস্ব)’র মুঠোফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, কমিটি তাদের সিলেক্ট করেছে। তাদের পরিবেশনা, তাদের খাবারের মান ও
পরিবেশের কারণেই প্রথম হয়েছে।

অতিরিক্ত দাম রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, মাত্রাতিরিক্ত দাম রাখার বিষয়টি আমার জানা নেই। এবিষয়ে আমি জানলে কার্নিভালের রেস্তোরাটি বন্ধ করে দিতাম।

আরও সংবাদ

জনপ্রিয় সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

আলোচিত সংবাদ

শিরোনামঃ