।।বিশেষ প্রতিবেদক।।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিশেষ আমন্ত্রণে জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবিবার বিকেলেই বাংলাদেশে ফিরে গেছেন। গত শুক্রবার দিল্লিতে পা রাখার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদীর ‘ফলপ্রসূ’ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও হয়েছে। নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে এনিয়ে গত ন’বছরে দিল্লি, ঢাকা বা শান্তিনিকেতনে দু’জনের মধ্যে অন্তত ন’বার মুখোমুখি দেখা হল। এছাড়া ভার্চুয়ালি তাঁদের মধ্যে কতবার বৈঠক হয়েছে, তার কোনও ইয়ত্তা নেই। লক্ষ্যণীয় হল, এই পুরো সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের যারা প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি (পার্লামেন্টে না-হলেও), সেই বিএনপি’র সঙ্গে ভারতীয় নেতৃত্বর প্রকাশ্যে অন্তত কোনও বৈঠকই হয়নি। না বাংলাদেশে, না ভারতে। প্রধানমন্ত্রী মোদী তো দূরের কথা, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা সিনিয়র ক্যাবিনেট মন্ত্রীরাও যখন বাংলাদেশ সফর করেছেন, তাঁরাও কেউ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বা ওই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করেননি। প্রশ্ন হলো: ভারতের সঙ্গে বিএনপির সমস্যাটা কোথায়?
অথচ এই সময়ের মধ্যে শুধু দু’দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মধ্যেই নয়, সরকারি বা দলীয় পর্যায়েও বিজেপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে বহুবার পাল্টাপাল্টি সফর, মতবিনিময় ইত্যাদি হয়েছে। কখনো ট্র্যাক ওয়ান, কখনো বা ট্র্যাক-টু পর্যায়ে। অন্যদিকে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে ভারত শেষবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ২০১২ সালের অক্টোবরে। তখন দিল্লির ক্ষমতায় ছিল মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে ইউপিএ-টু সরকার, দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন সালমান খুরশিদ। সেই সফরের পরও ভারতীয় নেতৃত্ব ও বিএনপি’র মধ্যে শীতলতা আদৌ কমেনি।
২০১৪ সালের মে মাসে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি ভারতের ক্ষমতায় আসার পরও সে পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি। বরং বিএনপি’র মধ্যে এই ধারণাই ক্রমশ বদ্ধমূল হয়েছে যে ভারত বাংলাদেশে শুধু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গেই সম্পর্ক রেখে চলে। বিএনপি’র শীর্ষ নেতারা ভারতের এই ‘অবস্থানে’র সমালোচনা করে বহুবার প্রকাশ্যেই কথা বলেছেন। কিন্তু বাস্তবেও পরিস্থিতিটা কী সত্যিই সে রকম? বাংলাদেশে ভারত যদি সত্যিই শুধু আওয়ামী লীগের সঙ্গেই সম্পর্ক রেখে চলে, তাহলে সেটা কেন? নাকি পর্দার আড়ালে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ আছে?
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের রাজনীতি, কূটনীতি বা নিরাপত্তাগত বিষয়গুলো নিয়ে যারা ওয়াকিবহাল এবং নিয়মিত মাথা ঘামান – দিল্লিতে এমন একাধিক বিশেষজ্ঞর সঙ্গে কথা বলে বিবিসি বাংলা এই প্রতিবেদনে সেই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খুঁজেছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের অর্ধশতাব্দীরও বেশি ইতিহাসে মোটামুটি তেইশ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকেছে। বাকি ২৭ বছর দেশটিতে হয় সামরিক শাসন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার অথবা বিএনপি সরকার ছিল। ভারতে পর্যবেক্ষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই ২৭ বছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক থেমে থাকেনি। এমনকি শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের মাত্র পাঁচদিনের মাথায় ঢাকায় ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত সমর সেন সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক আহমেদের সঙ্গে। পরদিন দু’জনের হাসিমুখে করমর্দনের ছবিও বেরিয়েছিলে ভারতের ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকার প্রথম পাতায়। “পুরো আশির দশকটা জুড়েই জেনারেল এরশাদের সরকারের সঙ্গেও ভারতের কিন্তু রীতিমতো সুসম্পর্ক ছিল”, মনে করিয়ে দিচ্ছেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, বিজেপি নেতা তথা বর্ষীয়ান সাংবাদিক এম জে আকবর।
কয়েক বছর আগেও যারা ভারত সরকারের হয়ে ‘বাংলাদেশ অ্যাফেয়ার্স’ দেখতেন, নরেন্দ্র মোদীর প্রথম ক্যাবিনেটের সদস্য মি আকবর তাদেরই একজন। তিনি বিবিসি বাংলাকে যা বলেছেন, তার মোদ্দা কথাটা হল – ভারতীয় নেতৃত্ব বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ছাড়াও আরও বহু দলের সঙ্গে বহু বছর ধরে ‘ডিল করেছে’। সাম্প্রতিক অতীতেও জাতীয় পার্টি, এমনকি সূফী ভাবধারার বহু ইসলামপন্থী দলকেও ভারতে সরকারিভাবে ‘দাওয়াত’ দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। ওই সব দলের নেতারা দিল্লিতে এসে ভারতের নেতা-মন্ত্রী, নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠকও করে গেছেন। কিন্তু বিএনপি’র কথাটা একেবারেই আলাদা – বিশেষ করে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মেয়াদে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়কার অভিজ্ঞতার পর থেকে। দিল্লিতে প্রবীণ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ শান্তনু মুখার্জি ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসেও দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। তিনি বলেন, “বিএনপি আমলে ভারতের নিরাপত্তাগত স্বার্থ যেভাবে কম্প্রোমাইজড হয়েছিল তাতে ওই দলটিকে নিয়ে আমাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সন্দেহ থাকাটা খুব স্বাভাবিক।” বিবিসি বাংলাকে তিনি আরও বলছিলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জঙ্গী গোষ্ঠীগুলো সে সময় বাংলাদেশে ঢালাও আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছিল – এমনকি সরকারি মদতে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ওই জঙ্গীদের জন্য বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের চালান পর্যন্ত পাঠানো হয়েছিল। “অথচ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সেই সব কর্মকাণ্ড সমূলে উৎপাটন করেছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতি এখন অনেকটাই শান্ত।” মি. মুখার্জি
বলেন, “যে রাজনৈতিক দলটির মদতে ভারতেরই একটা বিস্তীর্ণ অংশে দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গীবাদ প্রশ্রয় পেয়েছে, তাদের সঙ্গে নতুন করে কোনও সম্পর্ক স্থাপনের আগে ভারতকে যে বহুবার ভাবতে হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ”
শুধু নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নয়, অর্থনীতি বা বাণিজ্যেও বিএনপি আমলে ভারতের অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর ছিল না। ওপি জিন্দাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত যেমন বলছিলেন, “খালেদা জিয়ার আমলেই কিন্তু এনার্জি ডিল (জ্বালানি চুক্তি) করার চেষ্টা ভেস্তে গিয়েছিল, বাংলাদেশে বিপুল বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েও ভারতের টাটা শিল্পগোষ্ঠী ব্যর্থ হয়ে ফিরেছিল।” সব মিলিয়ে ওই পাঁচ বছরের বিএনপি শাসনে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যেকার কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। আর সেই তিক্ত অভিজ্ঞতাই আজ দেড় দশক পরেও ভারতকে বিএনপি সম্পর্কে সন্দিগ্ধ করে রেখেছে।
বিএনপি-কে ঘিরে ভারতের আর একটা বড় সমস্যা হল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তাদের সংস্রব। “জামায়াতে ইসলামী ভারতের চোখে প্রায় একটি নিষিদ্ধ সংগঠন। আর ভারত আজও বিশ্বাস করে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি এখনও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলে”, বিবিসিকে বলছিলেন দিল্লিতে সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক জয়ন্ত ঘোষাল। যতদিন না জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি’র সম্পর্ক পাকাপাকিভাবে ছিন্ন হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত ভারতের পক্ষে বিএনপি’র সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করাও একরকম অসম্ভব বলেই মি. ঘোষালের অভিমত।





















