।।বিডিহেডলাইন্স ডেস্ক।।
বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে নজিরবিহীন বন্যা দেখার কথা জানিয়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের কারণে সাঙ্গু আর মাতামুহুরি নদী উপচে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি আর কক্সবাজারের বহু অঞ্চল তলিয়ে গেছে। পাহাড়ি এলাকাগুলোয় এর আগে এরকম বন্যা আর দেখা যায়নি।
বান্দরবান শহর এলাকাও পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আর সাব-স্টেশনগুলোয় পানি ঢুকে পড়ায় গত তিনদিন ধরে শহর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। চার্জ দিতে না পারায় সেখানকার বেশিরভাগ মানুষ মোবাইল বা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন না। সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
সাঙ্গু ও মাতামুহুরি নদী যেসব এলাকা দিয়ে বয়ে গেছে, তার আশেপাশের সব এলাকাই বন্যাক্রান্ত হয়েছে। কক্সবাজারের চকোরিয়ার বাসিন্দা মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘মা স্ট্রোকের রোগী হওয়ায় কোথাও যেতে পারি নাই। খাটের নীচে পাঁচটা ইট দিয়ে উঁচু করে ঘরের মধ্যেই আছি, বাইরে বের হওয়ারও কোন সুযোগ নাই। আশেপাশের বহু মানুষ যেভাবে পারছে, অন্যদিকে চলে গেছে।’ সবশেষ ১৯৮৮ সালে এরকম বন্যা দেখেছিলেন তিনি।
পাহাড়ি অঞ্চলগুলোয় হঠাৎ করে এরকম বন্যার পেছনে কয়েকটি কারণ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সরদার উদয় রায়হান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘এবারের বন্যার পেছনে মূল কারণ হলো গত কয়েকদিনের বৃষ্টি। সাধারণত পুরো অগাস্ট মাসে বান্দরবানে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয় গড়ে সাড়ে ৪০০ মিলিমিটার। কিন্তু গত চার তারিখ থেকে আট তারিখ- এই পাঁচদিনে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৮০০ মিলিমিটারের বেশি। অর্থাৎ একমাসের চেয়ে দ্বিগুণ বৃষ্টি হয়ে গেছে পাঁচদিনে।’
কম সময়ে বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় মাতামুহুরি এবং সাঙ্গু নদীতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি পানি প্রবাহিত হয়েছে। পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টির পানি নদীতে একসাথে নামতে গিয়ে উপচে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। যেসব এলাকা দিয়ে এই দুটি নদী প্রবাহিত হয়েছে, তার আশেপাশের এলাকা মূলত বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে।
বন্যার পেছনে আরও কয়েকটি কারণ দেখছেন বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরদার উদয় রায়হান জানান প্রতিবছরই নানা কারণে বাংলাদেশের নদ-নদীর পানি বহনের ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে বেশি বৃষ্টিপাত হলে বা নদীতে পানি বেড়ে গেলে সহজেই আশেপাশের এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জনসংখ্যা ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ার ফলে পাহাড়ি এলাকাগুলোয় নদীর কাছাকাছি নিচু এলাকায় আগে জনবসতি ছিল না। কিন্তু এখন সেখানে ঘরবাড়ি তৈরি হয়েছে। ফলে নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় এসব এলাকা বন্যাক্রান্ত হয়ে পড়ছে।
তবে বন্যার কারণ হিসাবে বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি অপরিকল্পিত উন্নয়নসহ আরও কয়েকটি কারণ দেখছেন স্থানীয়রা।
কক্সবাজারের সাংবাদিক তোফায়েল আহমেদ বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার যে রেললাইনটি তৈরি করা হয়েছে, সেখানে অনেক জায়গায় একপাশ থেকে অন্যপাশে পানি চলাচলের জায়গা বা কালভার্ট রাখা হয়নি। ফলে আগে পাহাড়ি বৃষ্টিপাতের পানি নেমে যেতে পারতো, কিন্তু এখন রেললাইনে এসে আটকে যাচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে এসব পানি লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই জেলার ৬০টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে বান্দরবানে বন্যার শিকার হয়েছে ২১ হাজারের বেশি মানুষ। সেখানে এ পর্যন্ত আটজনের মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মোঃ. এনামুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, বন্যার পানি নেমে গেলেই ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হবে। আপাতত দুর্গত মানুষদের জন্য খাদ্য সহায়তা বরাদ্দ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে এসব নদী যাতে খনন করা হয়, সেই সুপারিশও করা হবে।





















